প্রথম হওয়া সোহেল ভেরিফিকেশনে বাদ

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৫ এএম

‘অভাবের সংসারে কত কষ্ট করে পড়াশোনা করাইছি, আল্লাহ জানে কেন এমন হইলো আমার ছাওয়ালটার সঙ্গে। এত কষ্ট করে পড়াশোনা করার পরে একটা চাকরি হয়েছে বলে টেকিছে। এখন শুনেছি আমার ছাওয়ালটাকে বাদ দিয়েছে। কেন বারে, আমার বাবাটার কী দোষ?’ চোখের পানি মুছতে মুছতে কথাগুলো বলছিলেন ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও চূড়ান্ত নিয়োগ গেজেটে নাম না থাকা সোহেল রানার মা শাহিদা বেগম।

নীলফামারী সদর উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের কুখাপাড়া গ্রামের কৃষক আবু হোসেনের ছেলে সোহেল রানা ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে ইতিহাস বিষয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তবে গত বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত চূড়ান্ত নিয়োগ গেজেটে তার নাম ছিল না। এর আগে গত বছরের ১১ নভেম্বর পিএসসি ৬৮৩টি পদের বিপরীতে ৬৬৮ জনকে মনোনয়ন দিয়ে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে। সেই তালিকায় ইতিহাস বিষয়ে প্রথম হয়েছিলেন সোহেল। কিন্তু পরে ভ্যারিফিকেশনে তিনি বাদ পড়েন। গত বুধবার তালিকার ৬১১ জনকে নিয়োগ দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়।

তবে চূড়ান্ত গেজেটে নিজের নাম না থাকার কারণ জানেন না সোহেল। তিনি বলেন, ‘৪৯তম বিসিএসে ইতিহাস বিভাগে শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলাম। দীর্ঘ ১০ মাস পর গেজেট প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু সেখানে আমার নাম না দেখে নিজেই হতভম্ব হয়ে গেছি! কী কারণে আমার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, সেটিও আমি জানি না। আমি কৃষকের সন্তান। আমার পরিবারের কেউই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে স¤পৃক্ত না। এমনকি আমার বা পরিবারের কারও বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা থানায় অভিযোগ নেই।’ পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রসঙ্গ তুলে সোহেল বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি অপরাধ, রাষ্ট্রবিরোধী কাজ বা সরকারবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকলে সাধারণত ভেরিফিকেশনে তা উল্লেখ করা হয়। তবে এসব বিষয়ের সঙ্গে তিনি বা তার পরিবার ন্যূনতম কোনোভাবে স¤পৃক্ত না।’

বিসিএসে অংশ নেওয়ার সময় সোহেল একটি চাকরি করতেন। পাশাপাশি দিন-রাত এক করে পড়াশোনা করেছেন। বিসিএসে সুপারিশ পাওয়ার পর অন্য চাকরির জন্য তেমন চেষ্টা করেননি জানিয়ে সোহেল বলেন, ‘সুপারিশপ্রাপ্তির পর ভেবেছিলাম বিসিএসে হয়ে যাবে। এ কারণে আর কোথাও সেভাবে চাকরির আবেদনও করিনি। এখন কী করব কিছু ভেবে পাই না।’

কৃষকের ঘর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : সোহেল ২০১৪ সালে স্থানীয় সোনারায়-সংগলশী উচ্চবিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ ৫ নিয়ে এসএসসি এবং ২০১৬ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে জিপিএ ৪.৯২ নিয়ে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। ২০২০ সালে সিজিপিএ ৩.৫৪ নিয়ে স্নাতক এবং ২০২১ সালে সিজিপিএ ৩.৫৬ নিয়ে স্নাতকোত্তর স¤পন্ন করেন।

সোহেলের বাবা আবু হোসেন বলেন, অভাবের সংসারে ছেলেকে পড়াতে গিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। শুধু এই আশায় ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছি, একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াবে, ভালো একটা চাকরি করবে। ছেলেকে পড়াতে গিয়ে জমি-জায়গা বিক্রি করেছি। অনেক কষ্ট করে তাকে এতদূর নিয়ে এসেছি। সোহেল বিসিএসে সুপারিশ পাওয়ার খবর পাওয়ার দিনের কথা স্মরণ করে আবু হোসেন বলেন, ‘যেদিন জানতে পারলাম, আমার ছেলে বিসিএসে টিকে গেছে, সেদিন আমাদের আনন্দের সীমা ছিল না। মনে হয়েছিল, এত বছরের কষ্ট অবশেষে সার্থক হয়েছে।’

কিন্তু গেজেটে ছেলের নাম না থাকায় পরিবারটি ভেঙে পড়েছে বলে জানান আবু হোসেন। তিনি বলেন, ‘যে ছেলে এত কষ্ট, পরিশ্রম ও মেধার মাধ্যমে বিসিএসে উত্তীর্ণ হলো, শেষ পর্যন্ত গেজেটে তার নাম নেই এটা একজন বাবা হিসেবে মেনে নেওয়া খুবই কষ্টের। সরকারের কাছে আমার অনুরোধ, আমার ছেলের বিষয়টি যেন বিবেচনা করা হয়। এত বছরের পরিশ্রম, ত্যাগ ও স্বপ্ন যেন এভাবে শেষ হয়ে না যায়।’

স্কুলের শিক্ষক ও এলাকাবাসী ব্যথিত : সোনারায়-সংগলশী উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক বিভূতিভূষণ রায় বলেন, সোহেল মেধাবী ছাত্র ছিল। ইতিহাস বিভাগে শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম স্থান পাওয়ার পরও গেজেটে তার নাম বাদ দেওয়ায় আমরা শিক্ষক ও এলাকাবাসী ব্যথিত। সোহেলের প্রতিবেশী মাজাহারুল ইসলাম বলেন, ‘সোহেলের বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ায় আমরা ভেবেছিলাম, এবার পরিবারটি একটু শান্তিতে থাকতে পারবে। কিন্তু এখন শুনলাম, তাকে নাকি রাজনৈতিক কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে আমার দেখা মতে, সে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল না।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত