একবার লোকসান হয়েছিল। সেই ধাক্কায় থেমে গেলে গল্পটা সেখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু শারমিন আক্তার থামেননি। সোনালি ও ব্রয়লার মুরগি পালনের অভিজ্ঞতা, ভুল থেকে শেখা আর সাত বছরের ধৈর্যকে পুঁজি করে এবার লেয়ার খামারে নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার তালবাড়িয়া গ্রামের এই নারী।
সংসারের কাজের পাশাপাশি নিয়মিত খামার সামলান শারমিন। চার সদস্যের পরিবার, ঘরের দায়িত্ব আর খামারের ব্যস্ততা সবকিছু মিলিয়ে তার প্রতিদিনের জীবন এখন কঠোর পরিশ্রমের। তবু নিজের উদ্যোগে কিছু করার তাগিদ তাকে এগিয়ে নিয়েছে। শারমিনের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার শুরু স্বামী মুনছুর রহমানের হাত ধরে। প্রথম দিকে তার স্বামী মুরগি পালনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কাক্সিক্ষত সাফল্য না পাওয়ার পর একসময় খামারের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন শারমিন। স্বামীর কাছ থেকে প্রায় এক লাখ টাকা নিয়ে শুরু করেন নিজের পথচলা।
প্রথম উদ্যোগেই বড় ধাক্কা আসে। প্রায় সাত বছর আগে ২ হাজার ৪০০ সোনালি মুরগি দিয়ে শুরু করেছিলেন তিনি। বাচ্চা কেনা, খাবার, ওষুধ, পরিচর্যা ও খামার প্রস্তুত করতে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয় তাকে।
সেই লোকসান তাকে ভয় পাইয়ে দিতে পারেনি। বরং কোথায় ভুল হয়েছিল, কীভাবে খরচ কমানো যায়, রোগবালাই সামলাতে কী করতে হয় এসব নতুন করে শিখতে শুরু করেন তিনি। এরপর ব্রয়লার ও সোনালি মুরগি পালনে ধীরে ধীরে লাভের মুখ দেখেন। এবার তিনি মন দিয়েছেন লেয়ার মুরগি পালনে। বাড়ির পাশের খামারে বর্তমানে কাজী ফার্মসের লাল পুলেট জাতের প্রায় ২ হাজার মুরগি রয়েছে। মুরগিগুলোর বয়স প্রায় সাড়ে তিন মাস। শারমিনের হিসাব অনুযায়ী, বাচ্চা, খাবার, ওষুধ ও পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত প্রায় সাত লাখ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে।
বর্তমানে খাবার, ওষুধ ও পরিচর্যা বাবদ প্রতি মাসে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে মুরগিগুলো থেকে ভালো আয় হবে বলে আশা করছেন তিনি। তার লক্ষ্য শুধু বর্তমান খামার টিকিয়ে রাখা নয়, ভবিষ্যতে এটিকে আরও বড় করা।
শারমিন বলেন, শুরুতে লোকসান হওয়ায় সময়টা কঠিন ছিল। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, চিকিৎসাসেবা, টিকা, ঋণ ও বাজারজাতকরণে সরকারি সহযোগিতা পেলে খামারটি আরও বড় করার ইচ্ছা রয়েছে তার। পড়াশোনাও থেমে থাকেনি শারমিনের। গুরুদাসপুরের বিলচলন শহীদ সামসুজ্জোহা সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন তিনি। চাকরির অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজের কর্মসংস্থানের পথ বেছে নিয়েছেন।
তার মতে, শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের শুধু চাকরির ওপর নির্ভর না করে ছোট পরিসরে হলেও উদ্যোগ নেওয়া উচিত। পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও ধৈর্য থাকলে ছোট উদ্যোগ থেকেও নিজের আয় তৈরি করা সম্ভব।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. কানিস ফারজানা বলেন, গুরুদাসপুর মুরগি পালনের জন্য উপযোগী এলাকা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে খামারিদের টিকা, রোগপ্রতিরোধ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে বর্ষাকালে ঠান্ডা, জ্বর ও আমাশয়সহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ে, তাই খামার পরিষ্কার রাখা ও বাড়তি সতর্কতা জরুরি। তালবাড়িয়ার ছোট্ট একটি খামারে এখন শারমিনের বড় স্বপ্ন। সাত বছর আগে যে হাতে লোকসানের হিসাব ছিল, সেই হাতেই এখন তিনি সম্ভাবনার নতুন অঙ্ক কষছেন।
শারমিনের গল্প তাই শুধু মুরগির খামারের গল্প নয়। এটি ব্যর্থতার পর আবার শুরু করার সাহসের গল্প যেখানে একবারের লোকসান শেষ কথা হয়ে ওঠেনি, বরং হয়ে উঠেছে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রথম পাঠ।