দেশে দিনে গড়ে ৮ শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে অন্তত দুই শিশু ধর্ষণ এবং একজন হত্যার শিকার হচ্ছে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) সাড়ে পাঁচ বছরের বেশি সময়ের (২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) তথ্য বিশ্লেষণ করে এমনটি জানা গেছে। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা আরও জানা গেছে, ধর্ষণের ঘটনার অর্ধেকের বেশি ভুক্তভোগী শিশু। এ ছাড়া দিনে অন্তত পাঁচজন শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মী ও শিশু অধিকার কর্মীরা বলছেন, শিশু অধিকারের পরিস্থিতি ক্রমান্বয়েই অবনতির দিকে এবং সেটি ধারাবাহিকভাবে হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। প্রযুক্তির আসক্তি, বাবা-মায়ের কর্মব্যস্ততা, যৌথ পরিবার কমে যাওয়া, সচেতনতার ঘাটতি, নানা কারণে একশ্রেণির মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়া, শিশু নির্যাতনের ঘটনায় বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এসব নানা কারণে দিন দিন শিশুরা অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
এইচআরএসএসের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারা বেশ কিছু জাতীয় দৈনিক, নিজস্ব অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে শিশুর ওপর সহিংসতা, নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার তথ্য সংগ্রহ করেছেন। যদিও শিশুদের ওপর নৃশংসতার প্রকৃত ঘটনা আরও অনেক বেশি এবং অনেক ঘটনা গণমাধ্যমে আসে না। প্রতি বছর অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ‘শিশু অধিকার দিবস’ পালিত হয়। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আজ মঙ্গলবার দিবসটি পালিত হবে। দিবসের সঙ্গে মিল রেখে ‘বিশ্ব শিশু সপ্তাহ’ পালিত হচ্ছে। এবারের শিশু অধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য ‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’। আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত ব্যক্তিদের শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়।
ধর্ষণের ঘটনায় অর্ধেকের বেশি ভুক্তভোগী শিশু : এইচআরএসএসের তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৬ হাজার ১৫৩ নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৪৮৭ জনই শিশু। তাদের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৩১ জনকে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২১ সালে ১ হাজার ৪৭ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এ ছাড়া ২০২২ সালে ৭৩২ জন, ২০২৩ সালে ৫৫৮ জন, ২০২৪ সালে ২৮৪ জন, ২০২৫ সালে ৪৭৪ জন এবং চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৯২ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছর ৯ মাসে দিনে অন্তত দুজন (১ দশমিক ৬৫ শতাংশ) শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ১ হাজার ২৫৫ কন্যাশিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।
দিনে এক শিশু হত্যার শিকার : পাঁচ বছর ৯ মাসে শিশুর ওপর নির্যাতন, নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে ৮ হাজার ৭২৫টি। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৯৮ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। ২০২১ সালে ২৫১ শিশু, ২০২২ সালে ৩৭২ শিশু, ২০২৩ সালে ৫২৯ শিশু, ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ ৬৬৪ শিশু, ২০২৫ সালে ২৮৮ শিশু এবং চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৯৪ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ দিনে এ হত্যার হার একজনের বেশি (১ দশমিক ২৪ শতাংশ)।
অন্যদিকে সাড়ে ৮ হাজারের বেশি ঘটনায় নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে ১১ হাজার ৪৫৮ শিশু। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১ হাজার ৭৫২ শিশু, ২০২২ সালে ১ হাজার ২৩২ শিশু, ২০২৩ সালে ১ হাজার ৬৫৩ শিশু, ২০২৪ সালে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৩৭৮ শিশু, ২০২৫ সালে ১ হাজার ৮৩ শিশু এবং চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৩৬১ শিশু নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছর ৯ মাসে দিনে পাঁচটির বেশি (৫ দশমিক ৪৬ জন) শিশু নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। পর্যালোচনায় আরও দেখা যাচ্ছে ৫ বছর ৯ মাসে দিনে গড়ে প্রায় ৮ শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যাকা-ের শিকার হয়েছে।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিশুদের ওপর নির্যাতনের অনেক ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না। বিশেষ করে ভুক্তভোগী শিশুদের বেশিরভাগ পরিবার হয় সামাজিক ও আর্থিকভাবে দুর্বল। ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো অনেক পরিবার সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে চেপে যান। রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক নানা কারণে শিশুদের জীবন ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। যার প্রভাব পড়ছে শিশুদের জীবনের ওপর। পরিবার বা স্বজনদের মধ্যেও এখন শিশু নিরাপদ নয়। তিনি আরও বলেন, ‘শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়। অপরাধীরা সেই সুযোগটিকেই বেছে নেয়। আর ঘটনার পর বিচারের দীর্ঘসূত্রতাও শিশুদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার বড় একটি কারণ।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও শিশু অধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংবিধান শিশুদের সমতা, বিশেষ সুরক্ষা, আইনের আশ্রয় এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করেছে। শিশু আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে শিশুদের সুরক্ষায় সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো দিয়েছে। এরপরও শিশু নির্যাতন বাড়তে থাকা প্রমাণ করে যে, পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক।’ তিনি বলেন, ‘শুধু আইন থাকাই যথেষ্ট নয় বরং দ্রুত তদন্ত, সময়মতো বিচার, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের অঙ্গীকার হওয়া উচিত প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।’