চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনায় গত তিন বছরে চার দেশের কোম্পানি এসেছে। আর সর্বশেষ এ বন্দরের সোনার ডিমপাড়া হাঁসখ্যাত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) বরাদ্দ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উত্তাপ বইছে। এর আগে ২০২৩ সালে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) ২২ বছরের জন্য সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়েকে, গত বছর পানগাঁও টার্মিনালকে ২২ বছরের জন্য সুইজারল্যান্ডের এমএসসি শিপিং কোম্পানিকে এবং লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ৪৫ বছরের জন্য ডেনমার্কের এপিমুলারকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এখন এনসিটিকে ১৫ বছরের জন্য দেওয়া হচ্ছে দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডকে। গত সপ্তাহে সরকারের অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রিসভার মিটিংয়ে খসড়া কনসেশন চুক্তির অনুমোদন দেওয়ার পর তা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করছে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারী ও বন্দর রক্ষা পরিষদ।
কোনোভাবেই চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটিকে বিদেশিদের বরাদ্দ দেওয়া যাবে না এবং তাদের সঙ্গে চুক্তি করা যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে বন্দর শ্রমিক-কর্মচারী পরিষদ। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে আন্দোলনকারীদের নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের হৃৎপিন্ড এটি কাউকে দেওয়া যাবে না। যদি কাউকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় তাহলে চট্টগ্রাম বন্দর সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হবে। শুধু বন্দর নয়, কুতুবদিয়া পর্যন্ত সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। কোনো কাজ হবে না।
তিনি আরও বলেন, আপনারা এনসিটি (নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল), সিসিটি (চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল) ও জিসিবি (জেনারেল কার্গো বার্থ) বিদেশিদের দিয়ে দিতে চান। এটা হতে দেওয়া যাবে না। পিসিটি কীভাবে সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছিল আমরা তা খতিয়ে দেখার দাবি জানাচ্ছি।
এনসিটির পরিবর্তে বে টার্মিনালে একাধিক টার্মিনাল বিদেশিদের দিয়ে দেন উল্লেখ করে ইব্রাহিম খোকন বলেন, আপনারা চট্টগ্রামকে বিজনেস হাব বানাতে চাইলে প্রয়োজনে বে টার্মিনালে এখন তিনটি টার্মিনালের জায়গায় আরও সাতটি টার্মিনাল বানিয়ে বিদেশিদের দিয়ে দেন। কিন্তু এনসিটি-সিসিটি-জিসিবি দিতে পারবেন না।
বন্দর পরিচালনায় সবার আগে সৌদি আরব : চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনায় সবার আগে যুক্ত হয় বিদেশি রাষ্ট্র সৌদি আরব। ২০১৭ থেকে ২০২২ সালে ১২২৯ কোটি টাকা খরচ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) নির্মাণ করেছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর এ টার্মিনালটি ২২ বছরের জন্য সৌদি আরবের রেডসি গেটওয়েকে বরাদ্দ দেয় তৎকালীন সরকার। আর এর মাধ্যমেই চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটরের শুরু হয়। পরে গত বছরের ১৭ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের পানগাঁও টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য ২২ বছরের জন্য বরাদ্দ দেয় সুইজারল্যান্ডের এমএসসি শিপিং কোম্পানিকে। একই দিনে সরকার ৪৫ বছরের জন্য পতেঙ্গার লালদিয়া চরে ‘লালদিয়া টার্মিনাল’ নির্মাণ ও ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ দেয় ডেনমার্কের এপিমুলারকে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার এনসিটিকে ১৫ বছরের জন্য বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়ার বিষয়ে সরকার সম্মত হয়। আর এটি পেতে যাচ্ছে দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড। একই সঙ্গে সিসিটি কনটেইনার টার্মিনালকে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়েকে বরাদ্দ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুরও নির্দেশনা দিয়েছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়।
আধুনিক বন্দরের স্বার্থে প্রাইভেট অপারেটরে যেতেই হবে : চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা এবং সংস্থাটির সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা বিশ্বেই বিভিন্ন বন্দর প্রাইভেটে চলে গেছে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে এটা ছাড়া উপায় নেই। আজ আন্দোলনের কারণে পিছু হটলেও আগামীতে দিতেই হবে।
তাহলে বিদেশিদের দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি আসছে কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি কোনো সমস্যা নয়। নিয়ন্ত্রণ তো থাকবে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের হাতে। কাস্টমসের অনুমোদন ছাড়া একটি কনটেইনার জাহাজ থেকে নামতে যেমন পারবে না তেমনি উঠতেও পারবে না। আবার ইয়ার্ড থেকে বেরও হতে পারবে না। অপরদিকে বন্দর পরিচালনার গাইড লাইন থাকবে বন্দরের হাতে। তাই এতে দেশি-বিদেশি কার হাতে পরিচালনার দায়িত্ব থাকলো সমস্যা নয়।
তাহলে বিতর্ক কেন হচ্ছে? এ প্রশ্নের জবাবে জাফর আলম বলেন, কোনো চুক্তিতে সরকার বরাদ্দ দিচ্ছে সেই চুক্তির গোপনীয় অংশের বাইরে বাকি অংশগুলো পাবলিক করে দিলেই কিন্তু আর সমস্যা থাকছে না।
প্রাইভেটাজাইশনের বিষয়ে চিটাগং চেম্বারের প্রেসিডেন্ট আমিরুল হক বলেন, ‘আমরা চাই দেশি-বিদেশি যৌথ অংশীদারের মাধ্যমে বন্দরের পরিচালনায় আসুক। এতে আমাদের দেশীয় কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা বাড়বে।’
একই মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার এসোসিয়েশনের (বাফা) সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন। তিনি বলেন, ‘ বন্দর কর্তৃপক্ষ রেগুলেটরি অথরিটি হিসেবে কাজ করে প্রাইভেট কোম্পানিগুলোকে পরিচালনার দায়িত্ব দিতে পারে। তবে এতে দেশি বিদেশি কোম্পানিকে যৌথভাবে দিলে আমাদের দেশের বিনিয়োগকারীদের সক্ষমতা অনেকাংশে বাড়বে।’
এনসিটি কেন সোনার ডিমপাড়া হাঁস? : চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান টার্মিনালগুলোর মধ্যে সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল হলো এনসিটি। ২০০৭ সালে ৭০০ কোটি টাকা খরচ করে নির্মিত এ টার্মিনালে চট্টগ্রাম বন্দরের ১৮টি কি গ্যান্ট্রিক্রেনের মধ্যে ১৪টি এখানে রয়েছে। ফলো চট্টগ্রাম বন্দরের জিসিবি (জেনারেল কার্গো বার্থ) ও সিসিটির (চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল) তুলনায় বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে এনসিটি। আর সবই দেশীয় অপারেটর দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। অপরদিকে সৌদি আরবের রেডসি গেটওয়ে পরিচালনা করছে পিসিটি (পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল)। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ এনসিটিতে, ৩৬ শতাংশ জিসিবিতে, ১৬ শতাংশ সিসিটিতে এবং প্রায় ৪ শতাংশ পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে হ্যান্ডলিং হয়েছে। আর এ জন্যই এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের আওতায় রাখার দাবি জানিয়ে আসছে শ্রমিক কর্মচারীরা।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে জিসিবি, এনসিটি, সিসিটি ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল রয়েছে। এসব টার্মিনাল দিয়েই চট্টগ্রাম বন্দরের সব পণ্য ওঠানামা হয়ে থাকে। এর বাইরে বঙ্গোপসাগরের তীরে হালিশহর সাগরপাড়ে নির্মাণ হতে যাওয়া বে টার্মিনাল ২০৩০ সালের মধ্যে অপারেশনে আসতে পারে। বে টার্মিনালে তিনটি টার্মিনাল নির্মিত হবে। এই তিনটির মধ্যে একটি ডিপি ওর্য়াল্ড এবং অপরটি পিএসএস সিঙ্গাপুর নির্মাণ ও পরিচালনা করবে। এ ছাড়া তৃতীয় মাল্টিপারপাস টার্মিনালটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পরিচালনার কথা থাকলেও এটিও অন্য কোনো দেশকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। একইভাবে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণের পর তা পরিচালনায়ও প্রাইভেট বিনিয়োগকারী আসতে পারে।