পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, গান, নাচ, কেরাত ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার জন্য দেশের কোমলমতি শিশুদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, বরং সকল প্রাণীর প্রতি সদয় হওয়া এবং পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল হওয়ার নৈতিক শিক্ষা অর্জনের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, এসব মানবিক গুণাবলি ও সুকুমার বৃত্তির অনুশীলনের মধ্য দিয়েই শিশুদের প্রকৃত অর্থে ‘মানুষের মতো মানুষ’ হয়ে উঠতে হবে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণে ‘শিশু অধিকার দিবস ২০২৬’ এবং শিশু একাডেমির সুবর্ণজয়ন্তী (৫০ বছর পূর্তি) উপলক্ষে আয়োজিত এক চোখধাঁধানো ও বর্ণাঢ্য উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে—‘শিশুর ভবিষ্যৎ হোক সুরক্ষিত’।
সকালে প্রধানমন্ত্রী একাডেমি চত্বরে এসে পৌঁছালে উপস্থিত কোমলমতি শিশুরা তাকে ফুল দিয়ে এবং উষ্ণ করতালির মাধ্যমে বরণ করে নেয়। শিশুদের এই উষ্ণ অভ্যর্থনা ও ভালোবাসায় আপ্লুত হন তিনি। এরপর সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে দিবসের মূল কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান।
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল শিশুদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দেশাত্মবোধক গান, নাচ, আবৃত্তি ও ঐতিহ্যবাহী পারফরম্যান্স মনোযোগ দিয়ে উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী ও অতিথিবৃন্দ। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা শেষে প্রধানমন্ত্রী নিজেই মঞ্চে গিয়ে ক্ষুদে শিল্পীদের কাছাকাছি যান, তাদের সঙ্গে কথা বলেন, কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের সঙ্গে স্মারক ফটোসেশনে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে শিশুদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শিশুরা তাদের নানা কৌতুহল, স্বপ্ন ও চাওয়া-পাওয়ার কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরে। প্রধানমন্ত্রীও অত্যন্ত স্নেহ ও ধৈর্য নিয়ে শিশুদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। শুধু ঢাকাই নয়, ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে আয়োজিত ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে শিশুরাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার ও নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করার সুযোগ পায়।
মতবিনিময় পর্ব শেষে প্রধানমন্ত্রী শিশু একাডেমির স্থায়ী জাদুঘর ভবনে প্রবেশ করেন। সেখানে শিশুদের নিজ হাতে আঁকা চমৎকার সব চিত্রকর্ম এবং আলোকচিত্রের গ্যালারি পরিদর্শন করেন। কচি-কাঁচাদের আঁকা ছবির মধ্যে ফুটে ওঠা শিশুমন ও দেশের প্রকৃতির বৈচিত্র্য দেখে তিনি গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি একই ভবনের নিচতলায় একাডেমিকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে নিয়ে যাওয়ার অংশ হিসেবে নবনির্মিত 'সোলার প্যানেল ও সাব-স্টেশন'-এর আনুষ্ঠানিক ফলক উন্মোচন করে এর উদ্বোধন করেন।
উৎসবে শিশুদের পক্ষ থেকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে একটি বিশেষ স্মারক উপহার দেওয়া হয়। এছাড়া, বাংলাদেশ শিশু একাডেমির প্রতিষ্ঠা সূবর্ণজয়ন্তী ও দীর্ঘ ৫০ বছরের পথচলাকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রকাশিত বিশেষ স্মারকগ্রন্থ ‘শৈশব’-এর মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ পরিচালনা করবে। তাই তাদের শুধু বইয়ের পাতার পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক প্রশান্তির জন্য খেলাধুলা এবং সৃজনশীল চর্চার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশুরা যখন ছোটবেলা থেকেই পশু-পাখি ও প্রকৃতির সুরক্ষায় সচেতন হবে, তখন তাদের মাঝে মানবিক মূল্যবোধ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
তিনি অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রতি অনুরোধ জানান, যেন শিশুদের ওপর পড়াশোনার অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি না করে তাদের আগ্রহের বিষয়গুলোকে বিকশিত হতে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত বিপুল সংখ্যক শিশু ও তাদের অভিভাবকরা উপস্থিত ছিলেন। উৎসবমুখর এই আয়োজনে শিশু একাডেমি চত্বর দিনভর শিশুদের কলকাকলি ও আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখরিত থাকে।