জাতীয় দলের জার্সিতে লিওনেল মেসির বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের শেষ মুহূর্তটি যখন সমাগত, তখন ফুটবল দুনিয়ায় শুরু হয়েছে এক গভীর নস্টালজিক আলোচনা। একজন মহাতারকাকে মাঠ থেকে রাজকীয় ও আবেগঘন বিদায় জানানোর এই সংস্কৃতি বিশ্ব ফুটবলে নতুন কোনো ইতিহাস নয়। এর আগেও ফুটবলের রাজা ও আইকনরা বুট জোড়া তুলে রাখার আগে নানা বর্ণিল ও ব্যতিক্রমী আয়োজনে সিক্ত হয়েছেন।
বর্তমান প্রজন্মের মহাতারকা লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টিও হতে চলেছে এমনই এক অবিস্মরণীয় আয়োজন। আর্জেন্টিনার জার্সিতে অবসরের ঘোষণা দেওয়ার পর দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আয়োজন করেছে এক জমকালো বিদায়ী প্রীতি ম্যাচ। বুয়েনস আইরেসের ঐতিহাসিক মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে এই ম্যাচের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের হাতে মশাল তুলে দিচ্ছেন এলএমটেন, যা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে।
তবে কিছু নজির তো ঘটেছে অতীতেও। পেলে-ম্যারাডোনাসহ বিভিন্ন দেশের কিংবদন্তিরা যখন বিদায় নিয়েছেন তখনও আবেগটাও কী ছিল এমনই ছিল? অতীতের সেই মহাতারকাদের সঙ্গে সময়ের কিংবদন্তিদের মিশেলের সেসব চিত্রে একটু ঘুরে আসা যাক।
ডিয়েগো ম্যারাডোনা (আর্জেন্টিনা)
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগপ্রবণ ও হৃদয়স্পর্শী বিদায়ের গল্পটি লিখতে গেলে সবার আগে আসবে ম্যারাডোনার নাম। ২০০১ সালে, জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচ খেলার দীর্ঘ সাত বছর পর এবং পেশাদার ফুটবল থেকে অবসরের চার বছর বাদে, আর্জেন্টিনার জার্সিতে আরও একবার মাঠে ফিরেছিলেন ম্যারাডোনা। তখন তার বয়স ৪১ বছর, আর ঠিক আগের বছরই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও সাবেক ক্লাব বোকা জুনিয়র্সের বিখ্যাত বোম্বোনেরা স্টেডিয়ামে তার উপস্থিতি উপচে পড়া ৫০ হাজার দর্শকের চোখে জল এনে দিয়েছিল। ম্যাচের দীর্ঘক্ষণ আগে থেকেই স্টেডিয়ামের চারপাশের রাস্তায় ভিড় জমিয়ে ভক্তরা তার নামে স্লোগান দিয়ে মুখরিত করে তুলেছিল পুরো এলাকা, যেখানে ‘রেস্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ একাদশের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই বিশেষ ম্যাচে দুটি গোল করার পাশাপাশি ম্যাচের শেষ মুহূর্তে নিজের জার্সি খুলে বোকা জুনিয়রসের রঙ প্রকাশ করে স্টেডিয়ামে উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত হয়ে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘আমি এই সম্মান কবরে নিয়ে যাব।’
পেলে (ব্রাজিল)
ফুটবলের রাজা পেলের বিদায়বেলাটিও ছিল বর্ণনাতীত এক ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে মারাকানা স্টেডিয়ামে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে শেষবারের মতো ব্রাজিলের হলুদ জার্সি গায়ে চাপিয়েছিলেন তিনি। প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ সেই ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামে ফুটবলের সম্রাটকে স্যালুট জানিয়েছিল পুরো ব্রাজিল, যা বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বিরল এক দৃশ্য হিসেবে স্মরণ করা হয়।
থিয়েরি অঁরি (ফ্রান্স)
ফ্রান্সের জার্সিতে থিয়েরি অঁরির বিদায় নেওয়ার ঘটনাটি ছিল ভিন্নধর্মী। ২০১০ সালে বুট জোড়া তুলে রাখলেও ফরাসি দৈনিক ‘লেকিপ’-এর উদ্যোগে ২০১৫ সালে ব্রাজিল প্রীতি ম্যাচের আগে তাকে সম্মান জানানোর এক বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু হয়। যদিও জাতীয় দলে খেলার বিষয়টি উপহার হওয়া উচিত নয় বলে মত দিয়েছিলেন কোচ রেমন্ড ডোমেনেক, তবে শেষ পর্যন্ত জিনেদিন জিদান, প্যাট্রিক ভিয়েরা ও মার্সেল দেশাইয়ের সঙ্গে মাঠে উপস্থিত থেকে ফরাসি সমর্থকদের উষ্ণ ভালোবাসা ও বিদায়ী সম্মান গ্রহণ করেন এই কিংবদন্তি স্ট্রাইকার।
লুকাস পোডোলস্কি (জার্মানি)
জার্মানির জার্সিতে লুকাস পোদোলস্কির বিদায়টা ছিল গল্পের মতো। ২০১৭ সালের মার্চ মাসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচে চমৎকার এক জয়সূচক গোল করে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান এই ফরোয়ার্ড। ‘গ্ল্যাডিয়েটর’ সিনেমার সুরের তালে দর্শকদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে দেওয়া অভিবাদন গ্রহণ করে মাঠ ছেড়েছিলেন পোডোলস্কি, যা জার্মান ফুটবল ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায় হয়ে আছে।
ওয়েসলি স্নেইডার (নেদারল্যান্ডস)
আমস্টারডামের জোহান ক্রুইফ অ্যারেনায় সম্পূর্ণ অভিনব এক ঢঙে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলেন ডাচ মিডফিল্ডার ওয়েসলি স্নাইডার। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পেরুর বিপক্ষে ম্যাচের পর মাঠের মাঝখানে একটি সাজানো লিভিং রুমের সোফায় সপরিবারে বসেছিলেন তিনি। বড় স্ক্রিনে সাবেক সতীর্থ ও কোচদের ভিডিও বার্তা দেখতে দেখতে সমর্থকদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ১৫ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন স্নেইডার।
ওয়েইন রুনি (ইংল্যান্ড)
ইংল্যান্ডের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ওয়েইন রুনির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে। ২০১৮ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে বিশেষ এক প্রীতি ম্যাচে নিজের ১২০তম ও শেষ ক্যাপ অর্জন করেন রুনি। ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) এই বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের সমর্থকদের সামনে রাজকীয় এক বিদায় সংবর্ধনা পান এই ইংলিশ ফরোয়ার্ড।
ডেভিড সিলভা (স্পেন)
স্পেনের স্বর্ণালী প্রজন্মের অন্যতম কারিগর দাভিদ সিলভা ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও দলটির জার্সিতে নিজের শেষ ম্যাচটি খেলেছিলেন বিশেষ এক সম্মান নিয়ে। ২০১৮ সালের শেষভাগে গ্রান কানারিয়ার এস্তাদিও দে গ্রান কানারিয়া স্টেডিয়ামে বসনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে প্রতীকী কিক-অফ নিয়ে মাঠে নামেন তিনি। স্যুট পরে মাঠে প্রবেশ করা এই তারকাকে উয়েফার পক্ষ থেকে বিশেষ ক্যাপ প্রদান করা হয়, যা তার ঐতিহাসিক অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখে।
লুইস সুয়ারেজ (উরুগুয়ে)
উরুগুয়ের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা লুইস সুয়ারেজ আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছিলেন সরাসরি মাঠের লড়াইয়ে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঐতিহাসিক সেন্তেনারিও স্টেডিয়ামে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের মধ্য দিয়ে নিজের বর্ণিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন এই ফরোয়ার্ড। গ্যালারিজুড়ে উপচে পড়া আবেগ ও সমর্থকদের দীর্ঘ অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে দেশের জার্সিকে চিরবিদায় জানান তিনি।
সুনীল ছেত্রী (ভারত)
ভারতীয় ফুটবলের দীর্ঘ পথচলার এক অন্যতম নায়ক সুনীল ছেত্রী। দীর্ঘ ১৯ বছরের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি টেনে ২০২৪ সালের জুনে বিদায় নেন তিনি। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী সল্টলেক স্টেডিয়ামে কুয়েতের বিপক্ষে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফিফা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচকে নিজের বিদায়ী মঞ্চ হিসেবে বেছে নেন এই কিংবদন্তি, যা ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
নিজের নতুন ক্লাব নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় মেসি