রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পরও বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আন্তর্জাতিক এই ঋণদাতা সংস্থাটি তাদের সর্বশেষ পূর্বাভাসে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে ছাঁটাই করেছে। এতে করে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর ২০২৬) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরের জন্য মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১.২ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে ৩.৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এর আগে গত এপ্রিল মাসের প্রাক্কলনে ৪.৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করা হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রবৃদ্ধির অনুমান কমানোর দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়।
নতুন সংশোধিত প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০১৯-২০ অর্থবছরের মহামারি চলাকালীন অর্জিত ৩.৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়েও নিচে নেমে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের এই পূর্বাভাস সরকার ঘোষিত ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের চেয়ে অনেকটাই কম। এর আগে গত মাসে আরেক আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ শতাংশ করেছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘায়িত জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের তীব্র ভঙ্গুরতা, ঋণের ধীরগতি এবং সরকারের কঠোর রাজস্ব নীতির কারণেই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। বিশ্বব্যাংকের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে চাহিদা কমে যাওয়ায় স্বল্পমেয়াদে তৈরি পোশাক রপ্তানি মন্থর থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে নেমেছিল, যা টানা তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক মন্দাকে নির্দেশ করে। উচ্চ সুদের হার এবং চড়া উৎপাদন খরচের কারণে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বেসরকারি বিনিয়োগ সংকুচিত হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের সার্বিক অবস্থাকে ‘অত্যন্ত নাজুক’ আখ্যা দিয়ে সংস্থাটি জানায়, ২০২৬ সালের জুনে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২.৮ শতাংশে।
অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৬ শতাংশে অবস্থান করতে পারে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান হ্রাসের কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও প্রকৃত আয় কমেছে। ফলে দারিদ্র্যের হার ১.১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ১০.১ শতাংশে পৌঁছাবে, যার ফলে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেস্মে বলেন, ‘অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্রদের সুরক্ষা দেওয়া এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।’