বাচ্চার জন্য ওষুধ তৈরি করে মা হাতি, মিলল গবেষণায় প্রমাণ

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম

বাচ্চার অসুস্থতা সারাতে গাছের পাতা ও শিকড় ব্যবহার করে ‘ওষুধ’ তৈরি করে খাওয়াতে পারে মা হাতি—এমন চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়। পশ্চিম কেনিয়ার মাউন্ট এলগনের গুহাবাসী হাতিদের দীর্ঘদিনের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন গবেষকরা।

গবেষণায় বলা হয়েছে, মাউন্ট এলগন এলাকায় বিচরণকারী হাতির পাল অন্তত ২৫ প্রজাতির উদ্ভিদ ব্যবহার করে। স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্যরা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এসব হাতির আচরণ পর্যবেক্ষণ করে আসছেন।

তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, মা হাতিরা বিভিন্ন গাছের পাতা ও শিকড় সংগ্রহ করে চিবিয়ে নরম করে। পরে এসব উদ্ভিদজাত উপাদান নিজেদের দুধের সঙ্গে মিশিয়ে বাচ্চাদের খাওয়ায়। গবেষকদের ধারণা, বাচ্চাদের স্বাস্থ্যগত উপকারের জন্যই এমন আচরণ করে থাকতে পারে হাতিরা।

স্থানীয় এক বন্যপ্রাণী স্কাউট জানান, তিনি হাতিদের ‘আঙ্গুরউইট’ নামে পরিচিত একটি উদ্ভিদ ব্যবহার করতে দেখেছেন। স্থানীয়ভাবে পেটব্যথাসহ বিভিন্ন অসুস্থতার চিকিৎসায় এই উদ্ভিদ ব্যবহার করা হয়। তার দাবি, মা হাতিরা এটি ‘বাচ্চাদের দেওয়ার ওষুধ’ হিসেবে ব্যবহার করছিল।

ওই স্কাউটের বর্ণনা অনুযায়ী, মা হাতিরা প্রথমে পাতাগুলো ছাড়িয়ে চিবিয়ে নরম করে। এর সঙ্গে অন্য কয়েকটি গাছের শিকড়ও চিবিয়ে মেশায় তারা। পরে নিজেদের দুধের সঙ্গে উদ্ভিদজাত উপাদান মিশিয়ে বাচ্চাদের খাওয়ায়। বাচ্চারা মিশ্রণটি চিবিয়ে শক্ত অংশগুলো ফেলে দেয় বলেও তিনি জানান।

জার্মানির হামবুর্গের বার্নহার্ড নকট ইনস্টিটিউট ফর ট্রপিক্যাল মেডিসিনের গবেষকদের প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের এসব প্রত্যক্ষ বর্ণনা হাতিদের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে ঔষধি উদ্ভিদ বেছে নেওয়ার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ খাবার সংগ্রহের সময় তারা এলোমেলোভাবে উদ্ভিদ খায় না; বরং শারীরিক প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট উদ্ভিদ বেছে নিতে পারে।

গবেষকদের মতে, আফ্রিকান হাতিদের স্ব-চিকিৎসার ক্ষমতা আগের ধারণার চেয়ে আরও বৈচিত্র্যময় ও জটিল হতে পারে। অসুস্থতার সময় নির্দিষ্ট উদ্ভিদ খুঁজে নেওয়ার পাশাপাশি তারা একই ধরনের প্রাকৃতিক উপাদান নিজেদের বাচ্চাদের চিকিৎসার জন্যও ব্যবহার করতে পারে।

তবে হাতিরা সত্যিই বাচ্চাদের নির্দিষ্ট অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ওষুধ তৈরি করে কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। বিষয়টি যাচাই করতে আচরণগত, আণবিক ও ফার্মাকোলজিক্যাল পর্যায়ে আরও বড় গবেষণার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

মাউন্ট এলগনের হাতিরা এর আগেও তাদের বিশেষ আচরণের জন্য পরিচিত। কেনিয়া-উগান্ডা সীমান্তে অবস্থিত মাউন্ট এলগনের গভীর গুহায় ঢুকে তারা দাঁত দিয়ে গুহার দেয়াল খুঁড়ে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও সোডিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ সংগ্রহ করে। আশপাশের বনের উদ্ভিদে এসব খনিজের ঘাটতি থাকায় হাতিরা খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় উপাদান যোগ করতে এভাবে গুহায় যায়।

নতুন গবেষণায় মাউন্ট এলগনের ঢালে জন্মানো কিছু উদ্ভিদকে অসুস্থ হাতিদের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে খুঁজে খাওয়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে। ফলে গবেষকদের ধারণা, প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে প্রয়োজনীয় ঔষধি উপাদান বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে হাতিদের সক্ষমতা আগের ধারণার চেয়ে বেশি হতে পারে।

এর আগে ২০২৫ সালে গ্যাবনের আফ্রিকান ফরেস্ট এলিফ্যান্ট নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, শরীরে পরজীবীর উপস্থিতি বেশি থাকা হাতিরা তুলনামূলক কম পুষ্টিকর হলেও কলাগাছের কাণ্ড ও পেঁপে গাছ বেশি খায়। এসব উদ্ভিদে অন্ত্রের পরজীবীর ওপর প্রভাব ফেলে এমন যৌগ রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।

ব্রাউন ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. এলডি ফ্রেইম্যান বলেন, এ ধরনের গবেষণা বনভূমি ধ্বংসের ফলে প্রাণী ও মানুষ উভয়েই তাদের প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক ওষুধের উৎস হারাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে আনে।

জাপানের নাগাসাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাইমেটোলজিস্ট অধ্যাপক মাইকেল হাফম্যান গবেষণাটিকে আকর্ষণীয় বলে উল্লেখ করলেও হাতিরা বাচ্চাদের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট চিকিৎসা তৈরি করে—এটি নিশ্চিত করতে আরও প্রমাণ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত