জেলের জালে বড় ইলিশ, নিলামে দাম ৭২৫০

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে জেলে সোহেল খানের খুঁটো জালে ধরা পড়েছে ২ কেজি ওজনের একটি বড় আকৃতির ইলিশ। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে কুয়াকাটা মৎস্য আড়তে নিলামে মাছটি ৭ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়।

মঙ্গলবার ভোররাতে কুয়াকাটার বাংলার ঘাটসংলগ্ন বঙ্গোপসাগর এলাকায় মাছটি ধরা পড়ে। পরে সকাল ১০টার দিকে জেলে সোহেল খান মাছটি বিক্রির জন্য কুয়াকাটা মৎস্য আড়তে নিয়ে আসেন। নিলামে মাছটি কিনে নেন কুয়াকাটা ঘরামী ফিশের পরিচালক জয়লান ঘরামী।

জেলে সোহেল খান জানান, তিনি প্রায় ৯ থেকে ১০ বছর ধরে বঙ্গোপসাগরের উপকূলের কাছাকাছি খুঁটো জাল দিয়ে ইলিশ ধরছেন। জাল তুলতে গিয়ে অন্যান্য মাছের সঙ্গে বড় ইলিশটি ধরা পড়ে। পরে ডাকের মাধ্যমে মাছটি ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়। সেই হিসাবে প্রতি কেজি ৩ হাজার ৬২৫ টাকা এবং ২ কেজি মাছটির মোট দাম ৭ হাজার ২৫০ টাকা।

সোহেল খান বলেন, সাধারণত এত বড় ইলিশ পাওয়া যায় না। প্রায় তিন বছর পর এবার তিনি এত বড় একটি ইলিশ পেয়েছেন। এর আগে ১৬ কেজি ওজনের একটি পাঙাশ মাছ পেয়েছিলেন। সেটি বিক্রি না করে জেলেরা মিলে ভাগ করে খেয়েছিলেন।

তিনি আরও বলেন, উপকূলের কাছাকাছি মাছ ধরার জেলেরা এখন আগের মতো মাছ পান না। তার দাবি, ট্রলিং জালের কারণে সাগরে মাছ কমে গেছে। গভীর সমুদ্রে ট্রলিং করে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ ধরে ফেলা হচ্ছে। বিশেষ করে গুঁড়া মাছ ধরার কারণে সাগরে ইলিশের পরিমাণও কমে যাচ্ছে বলে তারা মনে করেন। মাছ কম পাওয়ায় অনেক সময় লোকসান কাটিয়ে ওঠাও কঠিন হয়ে পড়ে।

সোহেল খান জানান, আর দুই দিন পর অবরোধ শুরু হওয়ায় তাদের সব জাল গুটিয়ে বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে। মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের জন্য মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। এ সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রেখে জেলেদের কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হবে।

কুয়াকাটা ঘরামী ফিশের পরিচালক জয়লান ঘরামী বলেন, ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা মণ দরে ডাকের মাধ্যমে মাছটি কিনেছেন তিনি। প্রতি কেজি ৩ হাজার ৬২৫ টাকা হিসেবে ২ কেজি মাছটির দাম পড়েছে ৭ হাজার ২৫০ টাকা। বাজারে এত বড় ইলিশ এখন খুব কম দেখা যায়। তাই নিলামের মাধ্যমে মাছটি কেনা হয়েছে। পরে মাছটি বিক্রির জন্য ঢাকায় পাঠানো হবে।

তিনি বলেন, এ ধরনের বড় মাছ পাওয়া গেলে জেলে থেকে শুরু করে আড়তদারসহ সংশ্লিষ্ট সবাই লাভবান হতে পারেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ী নেছার উদ্দিন হাওলাদার বলেন, ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা কেজি দরে ইলিশ কেনা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কঠিন। আগে বছরে অন্তত এক-দুবার ঘরে ইলিশ মাছ উঠলেও এখন সেটিও অনেকটা স্বপ্নের মতো হয়ে গেছে।

স্থানীয় রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী ও বরিশাল গেট রেস্টুরেন্টের পরিচালক বাবু জানান, ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা কেজি দরে বড় ইলিশ কিনে রেস্টুরেন্টে বিক্রি করা তাদের জন্য কঠিন। বেশি দামে ইলিশ কিনলে পর্যটকদের কাছেও বেশি দামে পরিবেশন করতে হয়। বড় ইলিশ পরিবেশন করলে অনেক পর্যটক খেতে চান না। তাই তারা সাধারণত ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম এবং সর্বোচ্চ ১ কেজি ওজনের ইলিশ তুলনামূলক কম দামে কিনে পর্যটকদের খাওয়ানোর চেষ্টা করেন।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাজারে ছোট আকারের ইলিশ প্রতি কেজি প্রায় ৭৫০ টাকা, কিছুটা বড় ইলিশ ১ হাজার টাকা, মাঝারি আকারের ইলিশ ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং বড় আকারের রাজা ইলিশ ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. রাজীব সরকার বলেন, ছোট ইলিশের অযাচিত আহরণ, নদীতে পানি কমে যাওয়া, বাঁধ ও স্লুইস গেটের কারণে মাছের অভিবাসনে বাধা, অবৈধ জালের ব্যবহার এবং সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির অভাবে বড় ইলিশের সংখ্যা কমছে। পাশাপাশি পানি দূষণ, প্ল্যাঙ্কটনের ঘাটতি, জলবায়ু ও লবণাক্ততার পরিবর্তনও ইলিশের প্রজনন ও খাদ্য সরবরাহে প্রভাব ফেলছে। এসব কারণে বড় ইলিশের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

কলাপাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী বলেন, বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়া অত্যন্ত ভালো খবর। এটি নিষেধাজ্ঞার সুফলও হতে পারে। বড় ইলিশে ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকায় এতে ওমেগা-৩ ও বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন রয়েছে, যা হৃদ্‌যন্ত্র, চোখ ও মস্তিষ্কের জন্য উপকারী। জালের প্রশস্ততা বাড়ানো হলে এ ধরনের বড় ইলিশ আরও বেশি ধরা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি জানান, আগামী ৮ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে ২২ দিনের জন্য ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি নিষিদ্ধ থাকবে। এ সময়ে ইলিশ রক্ষায় মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে উপজেলা প্রশাসন, কোস্ট গার্ড, নৌ পুলিশ ও থানা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। ৬ অক্টোবর থেকে কলাপাড়া, আলীপুর, মহিপুর, আশাখালী, দুলাসার, চাপলী ও কুয়াকাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে জেলেদের সচেতন করা হচ্ছে।

মৎস্য কর্মকর্তা আরও জানান, কলাপাড়া উপজেলার নিবন্ধিত ১৮ হাজার ৩৬৪ জন জেলের জন্য ৪৫৯ দশমিক ১০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ হয়েছে। প্রত্যেক জেলে ২৫ কেজি করে চাল পাবেন। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখতে নদী ও সমুদ্র এলাকায় নিয়মিত অভিযান ও কঠোর নজরদারি চালানো হবে, যাতে কেউ অবৈধভাবে ইলিশ শিকার করতে না পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত