পোশাকে রঙবদল

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২০ এএম

পূজার পোশাকের কোনো একক ফ্যাশন ট্রেন্ড নেই। কারও কাছে পূজা মানে লালপাড় সাদা শাড়ি, কারও কাছে জামদানি সিল্কের ঝলক, কারও কাছে আরামদায়ক সালোয়ার-কামিজ, আবার কারও কাছে টপস আর স্কার্টের আধুনিক সাজ। এবারের পূজার ফ্যাশন যেন সেই বৈচিত্র্যকেই স্বীকৃতি দিচ্ছে। দেশীয় কাপড় থাকছে, তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন কাট ও নকশা। লাল-সাদার পাশাপাশি নানা রঙের মেলা। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

শারদীয় দুর্গাপূজা মানেই কাশফুলের দোলা, শিউলি ফোটা, ঢাকের শব্দ আর নতুন পোশাকের অপেক্ষা। পূজার দিনগুলোয় ম-পে ম-পে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নিজের সাজটাকেও একটু আলাদা করে তোলার ইচ্ছা। তাই পূজা এলেই পোশাকের বাজারে শুরু হয় রঙ, নকশা ও কাপড়ের নতুন গল্প। এবারের পূজার ফ্যাশনেও সেই গল্পে এসেছে বেশ কিছু পরিবর্তন। চিরচেনা লাল-সাদা শাড়ি যেমন নিজের জায়গা ধরে রেখেছে, তেমনি তার পাশে জায়গা করে নিয়েছে হলুদ, বাসন্তী, কমলা, নীল, গেরুয়া, অফ-হোয়াইট কিংবা মাটির কাছাকাছি রঙ। শাড়ির পাশাপাশি সালোয়ার-কামিজ, কুর্তি, টপস, পালাজ্জো, কাফতান কিংবা স্কার্টেও দেখা যাচ্ছে উৎসবের আবহ। অর্থাৎ পূজার পোশাক এখন আর একটি নির্দিষ্ট ঘরানায় আটকে নেই।

শাড়িতে চিরন্তন আবহ

পূজার ফ্যাশনে শাড়ির আবেদন কখনো পুরনো হয় না। বিশেষ করে অষ্টমী ও দশমীর সাজে লাল-সাদা শাড়ির জনপ্রিয়তা এখনো তুঙ্গে। তবে এবার সেই পরিচিত কম্বিনেশনেও এসেছে নতুনত্ব। অফ-হোয়াইট জমিনে লাল পাড়, লাল বা গেরুয়া জমিনে সূক্ষ্ম সুতার কাজ, শিউলি ফুল, ফুলেল মোটিফ, জামদানি নকশা কিংবা হাতে আঁকা নকশা সবই জায়গা করে নিয়েছে পূজার শাড়িতে। সাম্প্রতিক পূজা-সংগ্রহগুলোতে নির্দিষ্ট দুটি রঙের বদলে বহু রঙের ব্যবহারও দেখা যাচ্ছে।

কাপড়ের ক্ষেত্রে তাঁত, সুতি, জামদানি, মসলিন, সিল্ক, তসর, হাফসিল্ক, কাতান ও বাটিকের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে সিল্ক শাড়ির প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বিশেষভাবে চোখে পড়ছে। আরাম, ঝলমলে ভাব এবং দীর্ঘ সময় পরও তুলনামূলক কম কুঁচকে যাওয়ার কারণে উৎসবের দিনে সিল্ক অনেকের প্রথম পছন্দ। দেশীয় তাঁতের শাড়িও থাকছে বাজেটবান্ধব বিকল্প হিসেবে। এ বছর পূজার শাড়িতে নানা রঙের চেকের পাশাপাশি একরঙা আড়ি চেকেরও ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে। আবার টাঙ্গাইল সুতি শাড়ির সঙ্গে চওড়া গঙ্গাযমুনা পাড়েরও ট্রেন্ড চলছে। রাতের গর্জিয়াস সাজের জন্য বেনারসি, জামদানি, মসলিন, বালুচুরিও অনেকে বেছে নিচ্ছেন। পূজার বিভিন্ন মোটিফ দেওয়া হাফসিল্কও অনেকে বেছে নিচ্ছেন।

সালোয়ার-কামিজে আরাম ও স্বচ্ছন্দ

সব দিন শাড়ি পরা সম্ভব নয়। বিশেষ করে পূজার সময় ম-পে ম-পে ঘোরাঘুরি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা পরিবারের সঙ্গে বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে আরামদায়ক পোশাকের প্রয়োজন হয়। সেই জায়গাটি দখল করে আছে সালোয়ার-কামিজ ও কডসেট।

এবার কামিজে দেখা যাচ্ছে লম্বা ও ফ্লেয়ার কাট, সরল কাট, এ-লাইন, অ্যাসিমেট্রিক হেমলাইন এবং সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি। গলার নকশা ও হাতার কাটেও বৈচিত্র্য রয়েছে। কোথাও ফুলের কাজ, কোথাও জ্যামিতিক মোটিফ, আবার কোথাও লেস, পুঁতি, পাথর বা সুতার কাজ দিয়ে উৎসবের আবহ তৈরি করা হয়েছে। ফেব্রিকেও স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সুতি, ভিসকস, লিনেন, জর্জেট, অরগাঞ্জা, সেমি-পিউর ও হাফসিল্কের মতো কাপড় ব্যবহার হচ্ছে। পূজার সংগ্রহে আবহাওয়া ও দীর্ঘ সময় পরার বিষয়টি মাথায় রেখে হালকা ও আরামদায়ক কাপড়ের ব্যবহার বাড়ছে। রঙের ক্ষেত্রে সাদা-লালের পাশাপাশি গোলাপি, নীল ও গোলাপির নানা শেড দেখা যাচ্ছে।

টপস-কুর্তিতে নিজস্ব ভাষা

পূজার সাজে টিন বা তরুণদের পছন্দ মিশ্র ডিজাইনের পোশাক। দেশীয় মোটিফের সঙ্গে আধুনিক কাট, টপসের সঙ্গে পালাজ্জো, কুর্তির সঙ্গে ডেনিম কিংবা লম্বা টপের সঙ্গে স্কার্ট এমন নানা কম্বিনেশন এবারও জনপ্রিয়। বিশেষ করে টপসের ডিজাইনে একঘেয়েমি নেই বললেই চলে। কোথাও ছোট প্রিন্ট, কোথাও ফুলেল নকশা, কোথাও এমব্রয়ডারি, কোথাও পলকা ডট। কেউ চাইছেন উৎসবের রঙ, কেউ আবার একরঙা টপস বা কুর্তাতে হাতের কাজ, স্ক্রিন প্রিন্ট কিংবা ব্লক প্রিন্ট। পূজা সংগ্রহে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজে শাড়ির পাশাপাশি টপস, কুর্তি, এথনিক পোশাক, শার্ট, লন কামিজ, পালাজ্জো ও কাফতান সেট দেখা যাচ্ছে ।

ডিজাইনে ব্যতিক্রমের ছোঁয়া

পূজার পোশাকে বৈচিত্র্যের অন্যতম কারণ বদলে যাওয়া জীবনযাপন। একই পোশাক পূজার ম-প, বন্ধুদের আড্ডা, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা পরবর্তী কোনো আয়োজনেও পরতে চান। তাই ডিজাইনাররা তৈরি করছেন এমন পোশাক, যেখানে উৎসবের ছোঁয়া আছে, আবার দৈনন্দিন ব্যবহারেও মানিয়ে যায়। আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে তরুণদের পছন্দে। তারা ঐতিহ্যকে পুরোপুরি বাদ দিতে চান না, আবার একেবারে পুরনো ধাঁচেও থাকতে চান না। ফলে জামদানি মোটিফ চলে আসছে টপসে, শিউলি ফুলের নকশা উঠছে শাড়িতে, দেশীয় কাপড়ের তৈরি হচ্ছে আধুনিক কাটের পোশাক। অর্থাৎ ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মাঝখানে তৈরি হচ্ছে নতুন একটি ফ্যাশন ট্রেন্ড।

ফেব্রিকস বড় গুরুত্ব পাচ্ছে

পূজার পোশাক বাছাইয়ে নকশার পাশাপাশি কাপড়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় পরার জন্য সুতি ও লিনেন যেমন আরামদায়ক, তেমনি সন্ধ্যার আয়োজনের জন্য সিল্ক, হাফসিল্ক, জর্জেট কিংবা মসলিন এনে দেয় একটু বেশি আভিজাত্য। দেশীয় কাপড়ের প্রতি আগ্রহও রয়েছে সবার। টাঙ্গাইলের সুতি তাঁত,  আড়ং তাঁত, জামদানি, রাজশাহীর সিল্ক, তাঁত ও হ্যান্ডলুমের ব্যবহার ফ্যাশনকে শুধু সুন্দরই করছে না, দেশীয় কারুশিল্পের সঙ্গেও ক্রেতাদের যুক্ত করছে।

দরদাম কেমন

পূজার পোশাক কিনতে বাজেটের পরিসর বেশ বড়। বলাকা সিল্কের দাম প্রায় ২ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়ে কাজভেদে ৬-৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ভেজিটেবল ডাই সিল্কের দাম প্রায় ৪ হাজার ৭০০ থেকে ১৩ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। কম বাজেটে হাফসিল্ক বা সাধারণ সুতি শাড়ি পাওয়া যায় ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকার মধ্যে। একটু ভালো মানের সিল্ক, তাঁত বা নকশার শাড়ির জন্য ২ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বাজেট রাখতে হবে। বিশেষ কাজের শাড়ির ক্ষেত্রে দাম ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এক্সক্লুসিভ কালেকশনের মধ্যে  বাজারে কিছু ডিজাইনার শাড়ির রয়েছে। যার  দাম ২ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্তও। ডিজাইন, কাপড় ও কাজের ওপর নির্ভর করে পূজার শাড়ির দাম এক হাজার টাকার কাছাকাছি থেকে শুরু করে ১০ হাজার, এমনকি বিশেষ ডিজাইনের ক্ষেত্রে অনেক বেশিও হতে পারে। থ্রি-পিস পাবেন ৩ হাজার ৫ হাজার টাকার এবং টপস বা কুর্তি পাবেন ১ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে। সালোয়ার-কামিজের ক্ষেত্রে ফেব্রিকস, ডিজাইন ও ব্র্যান্ডভেদে কমবেশি হতে পারে।

কোথায় মিলবে পছন্দের পোশাক

ঢাকায় পূজার কেনাকাটার জন্য গাউছিয়া, নিউমার্কেট, চাঁদনী চক, ধানমন্ডি, আজিজ সুপার মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি ও বিভিন্ন দেশীয় ফ্যাশন হাউজের শোরুমে পাওয়া যাচ্ছে নানা ধরনের পোশাক। বিশেষ করে শাড়ির জন্য গাউছিয়া ও ধানমন্ডির বাজারে যেমন বৈচিত্র্য আছে, তেমনি দেশীয় ও আধুনিক পোশাকের জন্য বিভিন্ন ফ্যাশন ব্র্যান্ডেও রয়েছে পূজা সংগ্রহ। দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোতে পূজা আয়োজনেও জামদানি, কাতান, সিল্ক, সুতি, তাঁত ও এমব্রয়ডারি শাড়ির পাশাপাশি থ্রি-পিস ও লেহেঙ্গাও পাওয়া যাচ্ছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত