এনজিও খাতে বিপর্যয়

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১১ এএম

বিদেশি অনুদান কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলো (বেসরকারি সংস্থা) অর্থায়ন সংকটে পড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর নিবন্ধিত এনজিওর দুই হাজার ২১৮টির মধ্যে পুরোপুরি বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল এমন দুই হাজার ১৭০ এনজিও এ তালিকায় রয়েছে। যাদের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমও নেই। বাকি ৪৮ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৫ শতাংশ সংস্থার ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থাকায় কোনোমতে টিকে রয়েছে।

গবেষণা ফলে বলা হয়েছে, অর্থায়ন সংকট দীর্ঘ হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি ও স্যানিটেশন, জলবায়ু এবং অন্যান্য সামাজিক সেবা কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) প্রতিবেদটি তৈরি করেছে। সংকট মোকাবিলায় সরকারি প্রকল্পে এনজিওকে যুক্ত করার সুপারিশ করেছে বিআইডএস।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিআইডিএস আয়োজিত ‘বিদেশ নির্ভরতা পেরিয়ে : বাংলাদেশে এনজিও অর্থায়নের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর নিবন্ধিত মোট এনজিও সংখ্যা দুই হাজার ৮০৭টি। এর মধ্যে দুই হাজার ২১৮টি এনজিওর তথ্য বিআইডিএসের গবেষণায় উঠে আসে। বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইশবাল গবেষণার সার্বিক বিষয় উপস্থাপন করেন।

সংস্থাটির মহাপরিচালক অধ্যাপক একে এনামুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ ছাড়া পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এসএম শাকিল আখতারসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

গবেষণার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বিআইডিএস জানিয়েছে, বিশে^র বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করায় ধনী দেশগুলো বেসরকারি সংস্থাগুলেতে সাহায্য কমাচ্ছে। এর ধাক্কা ধীর গতিতে এলেও প্রভাব হবে স্থায়ী। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে সংস্থাটি বলছে, ২০২৫ সালে ধনী দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা ২৩ শতাংশ কমেছে, যা এক বছরে সবচেয়ে বড় পতন। যুক্তরাষ্ট্র তার সাহায্য সংস্থা ইউএসএআইডি বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সও আগামী কয়েক বছরের জন্য সাহায্য বাজেট কমিয়ে প্রতিরক্ষায় সরিয়ে নিয়েছে। ফলে এ অর্থায়ন সহজে ফিরে আসবে না।

বিআইডিএস জানিয়েছে, বাংলাদেশে এর পুরো ধাক্কা এখনো লাগেনি। কারণ আগে অনুমোদিত প্রকল্পের টাকা এখনো ছাড় হচ্ছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১০ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা এসেছে। কিন্তু নতুন প্রকল্পের অনুমোদন ২০২১-২২ সালের তুলনায় কমেছে। আলোচ্য সময়ে দুই হাজার ৬১টি প্রকল্প অনুমোদন হলেও ২০২৫-২৬ সালে তা এক হাজার ৬৫৪টিতে নেমেছে। এর ফলে দুই হাজার ২০০টি ছোট ও মাঝারি এনজিও সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়েছে। এসব এনজিওর মধ্যে অনেকগুলোর ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নেই এবং যারা প্রায় পুরোপুরি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল।

গবেষণা পদ্ধতির বিষয়ে সংস্থা জানিয়েছে, এনজিওবিষয়ক ব্যুরো ও মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ৪৮টি এনজিওর ওপর জরিপ, জাতীয় পরামর্শ সভা, দেশের উত্তরাঞ্চলের ছোট ও মাঝারি এনজিওর সঙ্গে দলীয় আলোচনা, বিশেষজ্ঞ সাক্ষাৎকার, দেশি-বিদেশি অভিজ্ঞতার পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি সেবার ক্ষেত্রে সরকার ও এনজিও দক্ষতা মূল্যায়ন করা হয়।

গবেষণায় অংশগ্রহণ করা ৪৮টি এনজিওর মধ্যে ৪১টি দেশি এবং আন্তর্জাতিক ৭টি। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ এনজিও ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি রয়েছে। যে কারণে বিদেশি অনুদানের ঘাটতি থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠান কোনোমতে টিকে রয়েছে।

অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিদেশি অনুদানের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। দেশের প্রয়োজন ও সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী এনজিওগুলোর সক্ষমতাকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে একটি নীতি-কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করলে দেশের উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষায় এনজিওগুলো আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে একদিকে তাদের অর্থায়নের বিকল্প তৈরি হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে এনজিওগুলোর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি দেশের সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশেও এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা বলেন তিনি।

অনুষ্ঠানে আলোচকরা বলেন, অর্থায়নের সংকট দেখা দিলে মাঠপর্যায়ের সামাজিক সেবায় এর প্রভাব পড়তে পারে। স্থায়ী ব্যয় বহাল থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মসূচি কমিয়ে দিতে বা কর্মী সংখ্যা কমাতে বাধ্য হতে পারে। কেউ কেউ টিকে থাকার জন্য সামাজিক কার্যক্রম কমিয়ে ক্ষুদ্রঋণ বা আয়মূলক কার্যক্রমে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া এনজিওগুলোর যোগাযোগ ও সেবা দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংকট মোকাবিলায় গবেষণায় চারটি বিকল্প অর্থায়নের পথের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো সরকারি ব্যয় ও প্রকল্পে এনজিওকে যুক্ত করা; করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অর্থ ব্যবহার; সামাজিক ব্যবসা এবং নতুন ধরনের অর্থায়ন ব্যবস্থা।

এছাড়া সংকট মোকাবিলায় যোগ্য এনজিওগুলোর একটি উন্মুক্ত তালিকা তৈরির সুপারিশ করেছে বিআইডিএস। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি ক্রয়, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অর্থসহ বিভিন্ন তহবিল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

পাশাপাশি সরকারি ক্রয়বিধিতে এনজিওকে সেবা প্রদানকারী হিসেবে যুক্ত করার বিধান কার্যকর করতে আলাদা নির্দেশিকা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। ছোট ও মাঝারি এনজিওর জন্য এনজিও ফাউন্ডেশন ও পিকেএসএফের মাধ্যমে তহবিল গঠন, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার নীতিতে যোগ্য বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ এবং সামাজিক ব্যবসার আইনি স্বীকৃতি ও কর সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত