হোমারের মহাকাব্য ‘ওডিসি’র সেই ক্লান্তিহীন বীরের দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শেষে অবশেষে আপন ঠিকানায় নোঙর ফেলার এক চিরন্তন আকুতি থাকে। তেমনি ফুটবল মাঠে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দাপট দেখিয়ে আসা লিওনেল মেসি যখন এস্তাদিও মনুমেন্তালে বেনিনের বিপক্ষে মাঠে নামলেন, তখন তা কেবল একটি প্রীতি ম্যাচ ছিল না; বরং তা ছিল এক বিশাল উপন্যাসের অন্তিম পূর্ণচ্ছেদ। জীবনের সমস্ত ঝড়-ঝাপ্টা পেরিয়ে, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার সীমানা পেরিয়ে আকাশী-নীল জার্সির সেই মহাকাব্যিক অভিযাত্রার শেষ মুহূর্তে তার জাদুকরী পা থেকে বেরিয়ে এল এক অমর সৃষ্টি, মেসির শেষ গোল।
বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে সেদিন ফ্লাডলাইটের আলো যেন একটু বেশিই ম্লান লাগছিল এক ঐতিহাসিক বিদায়ের ব্যথায়। বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় দিয়ে বর্ণিল এই আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের ইতি টানেন বিশ্ব ফুটবলের এই জাদুকর। বিদায়ী রাতেও নিজের চিরচেনা ছন্দে দ্যুতি ছড়িয়ে ম্যাচে দুই গোল ও এক অ্যাসিস্টের অনবদ্য অবদান রাখেন তিনি।
ম্যাচের তখন ৭১ মিনিট চলছে। ডি-বক্সে ফাউলের সুবাদে পেনাল্টি পেতেই বলের সামনে এসে দাঁড়ালেন চিরচেনা সেই জাদুকর। এক পলকের স্থিরতা, এরপর নিখুঁত ও ঠান্ডা মাথায় নেওয়া এক নিখুঁত শটে বেনিনের জাল কাঁপিয়ে দিলেন তিনি। বল জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো স্টেডিয়াম। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে এসে এভাবেই নিজের ১২৬তম ও শেষ গোলটি করেন মেসি।
মেসির এই ১২৬ গোলের অধ্যায়ের শুরুটা ছিল আজ থেকে ২০ বছরেরও বেশি সময় আগে, মনুমেন্তাল থেকে প্রায় ১১ হাজার ২২০ কিলোমিটার দূরে, সুইজারল্যান্ডে। ১ মার্চ ২০০৬ সালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে একটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে আলবিসেলেস্তেদের জার্সিতে নিজের প্রথম গোলটা করেছিলেন মেসি। সেই ম্যাচেই অভিষেক হয়েছিল সময়ের আরেক মহাতারকা লুকা মদ্রিচের।
সেখান থেকে সময়ের কাঁটা পেরিয়ে ফুটবলের অভিধানের সব বিশেষণ নিজের নামের জুড়ে মনুমেন্তালে শেষবারের মতো বল জালে জড়ালেন মেসি।
মাঠের লড়াইয়ে ২১ বছরের এই দীর্ঘ ও বর্ণিল পথচলায় মেসি গড়ে গেছেন অজস্র রেকর্ড ও কীর্তি, যা আগামী প্রজন্মকে যুগ যুগ ধরে রূপকথার গল্পের মতো অনুপ্রেরণা জোগাবে।
|
বিভাগ |
রেকর্ড ও অর্জনসমূহ |
|
সর্বোচ্চ ম্যাচ |
২০৮ ম্যাচ (আর্জেন্টিনার জার্সিতে সর্বাধিক উপস্থিতি) |
|
সর্বোচ্চ গোল |
১২৬টি গোল (আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা) |
|
বিশ্বকাপ গোল |
বিশ্বকাপে ২১ গোল (কিলিয়ান এমবাপ্পের পর বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং আর্জেন্টিনার জার্সিতে সর্বোচ্চ) |
|
বিশ্বকাপ ম্যাচ |
বিশ্বকাপে ৩৪ ম্যাচ (বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড) |
|
অধিনায়কত্ব |
১৩৮ ম্যাচে (আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ) |
|
হ্যাটট্রিক |
১১টি |
|
পঞ্জিকাবর্ষে গোল |
১৮ গোল (২০২২ সালে এক পঞ্জিকাবর্ষে রেকর্ড আন্তর্জাতিক গোল) |
|
বাছাইপর্বের গোল |
দক্ষিণ আমেরিকা বিশ্বকাপ বাছাইয়ে সর্বোচ্চ ৩১ গোল |
|
ফ্রি-কিক গোল |
১২ গোল |
|
আন্তর্জাতিক শিরোপা |
ফিফা বিশ্বকাপ (২০২২), কোপা আমেরিকা (২০২১, ২০২৪), ফিনালিসিমা (২০২২), অলিম্পিক স্বর্ণপদক (২০০৮) |