শহীদ আবরার ফাহাদের আত্মদান গোটা জাতিকে আরও বেশি সংগঠিত করেছে এবং আগ্রাসী ও সম্প্রসারণবাদী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তি জুগিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অডিটরিয়ামে শহীদ আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
রিজভী বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্রের লড়াই করছি, সবকিছু করছি। কিন্তু দেশের প্রশ্নে, জাতির প্রশ্নে আমরা কখনোই আত্মসমর্পণ করব না। আমরা আমাদের যে অস্তিত্ব, আমাদের যে ভূমি—এটিকে রক্ষা করার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করব।’
আবরার ফাহাদের আত্মদানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আবরারের আত্মদানের মধ্য দিয়ে ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী’ কথাটি নতুন করে প্রমাণিত হয়েছে। জনগণের স্বার্থের বাইরে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে জনগণ তা মেনে নেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রিজভী বলেন, ‘তোমরা হয়তো অনেক কিছুই করতে পারো, অনেক চুক্তি করতে পারো। কিন্তু জনগণ বিনা যুদ্ধে আমার স্বার্থের বাইরে কিছু যায়, সেখানে আপস করবে না।’
তিনি বলেন, আবরারের আত্মদানকে শুধু একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখলে হবে না। তার ফেসবুক পোস্টের প্রতিটি শব্দ ছিল অত্যন্ত ধারালো, শানিত ও তীক্ষ্ণ। দেশের শত্রু এবং যারা বাংলাদেশকে করায়ত্ত করতে চায়, আগ্রাসী থাবার মধ্যে রাখতে চায়—আবরারের বক্তব্য ছিল তাদের বিরুদ্ধে।
রিজভী বলেন, আবরারকে আক্রমণ ও হত্যার মধ্য দিয়ে তাকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, যাতে এ ধরনের কথা লিখতে আর কেউ সাহস না করে। কিন্তু সেই বার্তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বরং আবরারের মৃত্যু গোটা জাতিকে আরও বেশি সংগঠিত করেছে এবং আগ্রাসী ও সম্প্রসারণবাদী শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধের শক্তির স্ফুরণ ঘটিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আবরার এদেশের জাতীয়তাবাদী শক্তির এক অনন্য উজ্জ্বল প্রজ্জ্বল প্রতীক। এই প্রতীককে কেউ অবগুণ্ঠন করে রাখতে পারবে না, একে কখনো কুণ্ঠিত করতে পারবে না।’
জাতীয়তাবাদী শক্তির বিভিন্ন সংগঠন এবং বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলো আবরারের চেতনাকে ধারণ করে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও এর অংশ। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পতাকা রক্ষায় সবাইকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করার আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনা সভায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, শহীদ আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ২০১৯ সালের ৮ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সর্বপ্রথম ছাত্রদল প্রতিবাদে নামে। ছাত্রলীগের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে সেদিন হাজার হাজার ছাত্রদলের নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থী প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলেন।
তিনি বলেন, আবরার ফাহাদের মতো ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে শত শত ছাত্রদল নেতাকর্মীকে পৈশাচিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। অনেক হত্যাকাণ্ডের কোনো সিসিটিভি ফুটেজ বা ডকুমেন্টস পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
রাকিব বলেন, ২০২৪ সালে গুম কমিশন গঠনের পরও অসংখ্য ছাত্রদল ও বিএনপি নেতাকর্মীকে চোখ বেঁধে, বালুর বস্তা বেঁধে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি আরও বলেন, আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বোঝা গেছে, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না। ক্ষমতা কুক্ষিগত করা এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বাংলাদেশকে একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার অভিপ্রায় থেকেই তারা এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ২০১৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল একদিনের জন্যও রাজপথ ছাড়েনি। আবরার ফাহাদের প্রতিবাদের ভাষার প্রশংসা করে তিনি বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শিষ্টাচারবহির্ভূত ও অশ্লীল কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা উচিত।
ছাত্রদল সভাপতি বলেন, শহীদ আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে প্রতিটি ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের তালিকা করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়ে আসছে ছাত্রদল।
এ সময় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুন্তাসির আল জেমির কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন রাকিব। তিনি বলেন, কীভাবে একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কারাগার থেকে পালিয়ে যায় এবং আজ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয় না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর নেপথ্যে বিশেষ কোনো গোষ্ঠী জড়িত রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পাশাপাশি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিচার ও তাদের প্রতিহত করার ক্ষেত্রে অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।