অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৭ এএম

মানুষ দুর্বল সৃষ্টি। মানুষের মধ্যে ভুল করার প্রবণতা রয়েছে। মানুষ তার প্রবৃত্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়। যখন কামনা ও ক্রোধ তাকে আচ্ছন্ন করে, তখন তা তাকে দুর্বল করে ফেলে এবং মন্দ কাজকে তার কাছে সুন্দর করে তোলে। ফলে তার দৃষ্টি অন্ধ হয়ে যায়। তার নফস তাকে পরিচালিত করে এবং তার দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ হয়ে পড়ে।

আমরা মানুষ। আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে। আমরা পরিপূর্ণ নই এবং ভুল থেকে মুক্তও নই। মানুষ ভুল করবে, হোঁচট খাবে, এতে দোষ নেই। কিন্তু দোষ হলো, সে ভুলের কাদায় পড়ে, তা দেখেও সেখানে পড়ে থাকে। অর্থাৎ নিজের ভুলের ওপর স্থির থাকে এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করে না। বরং তার বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত, যখনই সে কোনো পিচ্ছিল ও বিপজ্জনক পথে পড়ে যাবে, তখনই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে উঠে দাঁড়াবে, সেখান থেকে ভালোর দিকে ফিরে আসবে।

নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন একই গর্ত থেকে দুবার দংশিত হয় না।’ (সহিহ বুখারি ৬১৩৩) এই হাদিস থেকে শিক্ষা হলো, একজন মুসলিমকে বিচক্ষণ ও সতর্ক হতে হবে। তাকে নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি থেকে সতর্ক থাকতে হবে।

হে আল্লাহর বান্দারা! যারা আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করেছে, অবাধ্য হয়েছে, তাদের পরিণতি থেকে শিক্ষা নিতে আল্লাহ আমাদের আহ্বান জানিয়েছেন। যখন আমরা তাদের মন্দ কৃতকর্মের কারণে তাদের ওপর পতিত আজাবের কথা চিন্তা করব তখন আমরা তাদের মতো কাজ করা থেকে সতর্ক থাকব, যাতে আমাদের ওপরও তাদের মতো শাস্তি নেমে না আসে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা কি জমিনে ভ্রমণ করে না? তাহলে তারা হৃদয় দিয়ে বুঝতে পারত, আর তাদের কান শুনতে পারত। প্রকৃতপক্ষে চোখ অন্ধ নয়, বরং বুকের ভেতর যে হৃদয় আছে তাই অন্ধ।’ (সুরা হজ ৪৬)

উপদেশ থেকে যারা উপকৃত হয়, তারা হলো তাকওয়াবান ও আল্লাহভীরু মানুষ। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই এতে শিক্ষা রয়েছে তার জন্য, যে ভয় করে।’ (সুরা নাজিয়াত ২৬)

হে আল্লাহর বান্দারা! মহান আল্লাহ কোরআনে বহু ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি এসব ঘটনা অনর্থক বর্ণনা করেননি। বরং এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা, উপদেশ ও সতর্কবার্তা গ্রহণ করার জন্যই বর্ণনা করেছেন।

মহান আল্লাহ বলেন, রাসুলদের যেসব সংবাদগুলো আমি তোমার কাছে বর্ণনা করলাম, এর দ্বারা আমি তোমার দিলকে মজবুত করছি, এতে তুমি প্রকৃত সত্যের জ্ঞান লাভ করবে। আর মুমিনদের জন্য এটা উপদেশ ও স্মারক।’ (সুরা হুদ ১২০)

তিনি আরও বলেন, ‘তাদের কাহিনিগুলোতে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।’ (সুরা ইউসুফ ১১১)

এসব মহান ঘটনাবলির মধ্যে নুহ (আ.)-এর ঘটনাও রয়েছে। মহান আল্লাহ বান্দাদের ওপর তার অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘পানি যখন কূল ছাপিয়ে সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন আমি তোমাদেরকে চলন্ত নৌযানে আরোহণ করালাম। যেন এ ঘটনাটিকে আমি তোমাদের জন্য শিক্ষামূলক করে রাখি এবং সংরক্ষণকারী কান তা সংরক্ষণ করে।’ (সুরা হাক্কাহ ১১-১২)

অতএব, নুহ (আ.)-এর নৌযান ও তার ঘটনাকে এমন শিক্ষা ও উপদেশের নিদর্শন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করবে।

লুত (আ.)-এর জাতির ধ্বংসের কথা উল্লেখ করার পর মহান আল্লাহ বলেন, ‘এতে আমি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য এক সুস্পষ্ট নিদর্শন রেখে দিয়েছি।’ (সুরা আনকাবুত ৩৫) অর্থাৎ তাদের ধ্বংসাবশেষ এমন সুস্পষ্ট শিক্ষা ও উপদেশ হয়ে রয়েছে, যা তাদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের কারণ, যারা আল্লাহর দলিলগুলো বুঝতে পারে এবং তার উপদেশ নিয়ে চিন্তা করে।

মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আদ ও সামুদকে (আমি ধ্বংস করেছিলাম), তাদের আবাসভূমির কিছু তোমাদের জন্য উন্মোচিত হয়েছে।’ (সুরা আনকাবুত ৩৮) অর্থাৎ তাদের বসতিগুলোর ধ্বংসাবশেষ এবং তাদের শূন্যতা তোমাদের কাছে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের ওপর আমার শাস্তি নেমে এসেছিল। এসব কিছুই তোমাদের শিক্ষা গ্রহণ ও উপদেশ নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

হে মুসলমানরা! শিক্ষা গ্রহণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং সুস্পষ্ট নিদর্শনগুলোর মধ্যে হস্তি বাহিনীর ঘটনাও রয়েছে। তারা পবিত্র কাবাঘর ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হয়েছিল। ফলে তাদের পরিণতি ভয়াবহ হয়েছিল। আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দেন। তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। কাবা ধ্বংস করা এবং পবিত্র ঘরের বিরুদ্ধে অশুভ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের যে উদ্দেশ্যে তারা এসেছিল, আল্লাহ তা ব্যর্থ ও নিষ্ফল করে দেন।

এত সতর্কবার্তা, এত শিক্ষা, একের পর এক নিদর্শন ও সতর্কীকরণ আসার পরও গাফেল মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে না। তাদের ওপর যা ঘটে কিংবা অন্যদের সঙ্গে যে ঘটনা ঘটে কিংবা আল্লাহ তাদের সামনে যে দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন, সেসব থেকেও তারা শিক্ষা নেয় না।

তাদের অবস্থা তাদের মতো, যাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা কি দেখে না যে, প্রতি বছর একবার বা দুবার তাদের পরীক্ষা করা হয়? তারপরও তারা তওবা করে না এবং উপদেশ গ্রহণ করে না।’ (সুরা তওবা ১২৬)

মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘তোমাদের কাছে তাদের ব্যাপারে স্পষ্ট হয়ে গেছে, আমি তাদের সঙ্গে কী করেছিলাম এবং তোমাদের জন্য দৃষ্টান্তও বর্ণনা করেছি।’ (সুরা ইবরাহিম ৪৫)

কিন্তু তারা তাদের পরিণতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেনি। আল্লাহ তাদের ওপর যে শাস্তি নাজিল করেছিলেন, তাতেও তারা সতর্ক হয়নি।

হে আল্লাহর বান্দারা! একজন বিবেকবান মানুষের উচিত, তার জীবনে যা কিছু ঘটে, যা কিছু সে শোনে এবং যা কিছু সে দেখে, সবকিছু থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করা। সে সৎ ও নেককার মানুষের ভালো কাজ অনুসরণ করবে এবং অত্যাচারী ও পাপীদের কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করবে।

মানুষ নিজের আত্মসমালোচনা করবে। সে তার নিজের কথা ও কাজ পর্যালোচনা করবে। যদি কোনো কাজ প্রশংসনীয় হয়, তাহলে সে তা অব্যাহত রাখবে এবং সেটার মতো ভালো কাজ আরও করবে। আর যদি কোনো কাজ নিন্দনীয় হয়, তাহলে সম্ভব হলে তা সংশোধন করবে, তা থেকে বিরত থাকবে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের কাজ করা থেকেও বিরত থাকবে।

কেউ যদি কিছু না জানে, তাহলে জিজ্ঞাসা করবে। যদি ভুল করে, তাহলে ফিরে আসবে। যদি অন্যায় করে, তাহলে অনুতপ্ত হবে। আর যখন অনুতপ্ত হবে, তখন সেই গুনাহ ছেড়ে দেবে। সে নিজের ভুল ও পদস্খলন অতিক্রম করতে এবং জীবনের পথে আসা বাধাগুলো পার হতে সদা সচেষ্ট থাকবে।

নবীজি (সা.)-এর একটি হাদিসে এসেছে, ‘প্রত্যেক মুমিন বান্দারই এমন কোনো গুনাহ থাকে, যা সে মাঝে মাঝে করে। অথবা এমন কোনো গুনাহ থাকে, যার ওপর সে অবিচল থাকে এবং দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার আগে তা ছাড়তে পারে না। নিশ্চয়ই মুমিনকে সৃষ্টি করা হয়েছে পরীক্ষায় নিপতিত, তওবাকারী এবং ভুলোমন হিসেবে। যখন তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় তখন সে উপদেশ গ্রহণ করে ও ফিরে আসে।’ (শুআবুল ইমান ৭১২৪)

এ থেকে বোঝা যায়, শিক্ষা গ্রহণের মধ্যে ভুল ও পদস্খলন থেকে সুরক্ষা রয়েছে। একটি প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা হলো, যে বেশি শিক্ষা গ্রহণ করে, তার পদস্খলন কম হয়। কারণ যে ব্যক্তি নিজের চারপাশের ঘটনাবলি থেকে বেশি শিক্ষা গ্রহণ করে এবং অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হয়, সে সুস্পষ্ট সত্য অনুসন্ধানে অধিক সতর্ক থাকে।

হে আল্লাহর বান্দারা! আরও একটি বাস্তব সত্য আমাদের উপলব্ধি করা উচিত। যে ব্যক্তি অন্যের পরিণতি দেখে শিক্ষা গ্রহণ করে না, একদিন অন্যরা তার পরিণতি দেখে শিক্ষা গ্রহণ করবে। প্রচলিত একটি যথার্থ প্রবাদ হলো, ‘সৌভাগ্যবান সে, যে অন্যের পরিণতি দেখে উপদেশ গ্রহণ করে।’

২ অক্টোবর শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। ভাষান্তর করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত