জাহাজ নির্মাণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীদের সক্ষম করে তুলতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো ‘ট্রিটমেন্ট, স্টোরেজ অ্যান্ড ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি’ (টিএসডিএফ) স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই অবকাঠামো নির্মাণে প্রয়োজন দেড় হাজার হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ ঋণ দেওয়ার জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে বৈশ্বিক ঋণ বিতরণকারী সংস্থা জাইকা, এডিবি, বিশ্বব্যাংক এবং চায়নার একটি ব্যাংক। তবে এটি ঋণের টাকায়, না সরকারি অর্থায়নে নির্মাণ করা হবে সে বিষয়টি এখনো পর্যালোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মীরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের বিপজ্জনক বর্জ্য পরিবেশসম্মত উপায়ে ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে টিএসডিএফ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি নির্মাণের জন্য জাপান মেরিন সায়েন্স (জেএমএস) সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। এতে বলা হয়েছে টিএসডিএফ স্থাপনে প্রয়োজন প্রায় ১ হাজার ৫শ কোটি টাকা। এই টাকা ঋণ দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক বড় বড় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রস্তাবনা দিয়েছে।
এর মধ্যে জাইকার প্রস্তাবনায় দেখা গেছে, সংস্থাটি ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ সুদে ঋণ প্রদান করতে চায়। তারা ৩০ বছরে এই ঋণ ফেরত নেবে যেখানে ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হবে। তবে এডিবি প্রস্তাব দিয়েছে আরও চড়া সুদে ঋণ প্রদানের। সংস্থাটি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দিতে চায় এবং পরিশোধের সময় দেবে ২০ বছর। বিশ^ব্যাংক অবশ্য তাদের প্রস্তাবে ২০ বছর মেয়াদি এই ঋণের সুদহার নির্ধারণ করতে চায় ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত। তবে সবচেয়ে কম সুদে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে চায়নার একটি ব্যাংক। ব্যাংকটি ৩ শতাংশ সুদে ২০ বছর মেয়াদে ঋণ প্রদানে আগ্রহ দেখিয়েছে।
জানা গেছে, গত ৬ অক্টোবর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্প বিষয়ে জাহাজ শিল্পসংক্রান্ত বিদ্যমান আইন, বিধি, নীতিমালা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় পর্যালোচনা এবং সুপারিশ প্রণয়ণের জন্য গঠিত কমিটি একটি সভা করেছে। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ, বন, ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এই সভায় অর্থায়নের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি।
সভায় পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেন, টিএসডিএফ না থাকায় ইউরোপীয় জাহাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বাংলাদেশে কাজ করতে দ্বিধা করছে এবং বিকল্প গন্তব্য বেছে নিচ্ছে। ফলে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ইউরোপীয় জাহাজে বিভিন্ন ধরনের উন্নতমানের পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান থাকে। এসব জাহাজ আকৃষ্ট করতে প্রয়োজনীয় বর্জ্য শোধন, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তির অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশগত মান নিশ্চিত করে শিল্পটির প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করতে টিএসডিএফ দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জাহাজের ক্রয়াদেশ পেতে হলে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সক্ষমতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। জাহাজ নির্মাণে এগিয়ে থাকা দেশগুলোর নীতিমালা মানদ- হিসেবে বিবেচনা করে দেশের প্রক্রিয়াগুলো সহজ করতে হবে।
তিনি বলেন, পরিবেশগত মান নিশ্চিতের প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা সৃষ্টি করে সম্ভাবনাময় এ খাতের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করা হবে না। এ জন্য টিএসডিএফ দ্রুত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এই সভায় জানানো হয়, আন্তর্জাতিক আইন, বিধি, কনভেনশনসহ বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ আইন, ২০১৮ এর বাধ্যবাধকতায় এ শিল্পের বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য মিরসরাইয়ে দ্রুত টিএসডিএফ স্থাপন করা প্রয়োজন। এটি নির্মাণে সরকার অর্থায়ন করবে না জাইকা, বিশ^ব্যাংক, এডিপি থেকে ঋণ নেওয়া হবে সে বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। দ্রুত অর্থায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করতে না পারলে এটির বাস্তবায়নও পিছিয়ে পড়বে।
জানা গেছে, ইতিমধ্যেই মিরসরাইয়ের জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সাব জোন-২৪ এ শিল্প মন্ত্রণায়ের এই টিএসডিএফ নির্মাণের জন্য ৫৯ দশমিক ৩৫ একর জমি চিহ্নিত করে তা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেজা শিল্প মন্ত্রণালয়কে অনাপত্তিপত্র প্রদানের পরই এই জায়গার ওপর জাপনি কোম্পানিটি সম্ভাব্যতার সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে।