কক্সবাজারের টেকনাফের সেন্টমার্টিন দ্বীপে মানবিক সেবার আড়ালে বাণিজ্য ও চরম চিকিৎসা অবহেলার ঘটনা ঘটেছে। আল মোমিন সমাজকল্যাণ ফাউন্ডেশন নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গত রবিবার ‘বিনামূল্যে সুন্নতে খতনা’ ক্যাম্পের মাধ্যমে ২ শতাধিক শিশুর খতনা করে। খতনার পর মঙ্গলবার পর্যন্ত অন্তত ৫০ শিশু ক্ষতস্থানে তীব্র সংক্রমণ (ইনফেকশন) ও অনবরত রক্তক্ষরণসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। কয়েকজন শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের জরুরিভিত্তিতে স্পিডবোটে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হয়েছে। দুজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
অভিভাবকরা জানিয়েছেন, চিকিৎসায় চরম গাফিলতি, অপরিচ্ছন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার, ত্রুটিপূর্ণ সেলাই এবং ভুল ওষুধ প্রয়োগের শিকার হয়েছে তাদের শিশুরা।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীরা জানান, কয়েকদিন আগে প্রায় ১৫০ জনের একটি ‘স্বেচ্ছাসেবী প্রতিনিধি দল’ দ্বীপে আসে। তারা উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের কাছ থেকে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা ও মানবিক কাজের মৌখিক অনুমতি নেয়। কিন্তু দ্বীপে পৌঁছানোর পরপরই তারা কোনো বিশেষজ্ঞ সার্জন বা ন্যূনতম চিকিৎসাগত প্রটোকল ছাড়াই শিশুদের সুন্নতে খতনা (মুসলমানি) করানোর একটি ক্যাম্প চালু করে।
শুরুতে ক্যাম্পটি সম্পূর্ণ ‘ফ্রি’ বা বিনামূল্যে করার ঘোষণা দিয়ে মাইকিং করা হলেও, শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা আসার পর শুরু হয় অর্থ আদায়। আয়োজকরা নিয়ম করেন প্রথম ১০০ জনের কাছ থেকে ‘টোকেন ফি’ বাবদ ১০০ টাকা এবং পরবর্তী প্রতি শিশুর জন্য ৭০০ টাকা হারে আদায় করা হয়। এভাবে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। মঙ্গলবার সকালে তাড়াহুড়ো করে পুরো দলটি দ্বীপ ছেড়ে গা-ঢাকা দেয়।
তীব্র যন্ত্রণা ও অভিভাবকদের আহাজারি : স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি দ্বীপ ত্যাগ করার পর পরই প্রকাশ পেতে থাকে তাদের চিকিৎসার আসল ভয়াবহতা। শিশুদের ক্ষতস্থানে তীব্র ব্যথা ও রক্তক্ষরণ শুরু হলে মঙ্গলবার সকাল থেকে আতঙ্কিত ও দিশেহারা অভিভাবকরা তাদের নিয়ে সেন্টমার্টিন ২০ শয্যা হাসপাতালে ভিড় করতে থাকেন।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের কোনাপাড়ার এক শিশুর বাবা রহমত উল্লাহ মঙ্গলবার বলেন, ‘ফ্রি চিকিৎসা দেবে শুনে ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু খতনা করার পর তারা জোর করে ৭০০ টাকা রেখে দেয়। আজ (গতকাল) সকাল থেকে বাচ্চার রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছে না, তীব্র জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। ওরা ডাক্তার নাকি কসাই আমরা জানি না! আমাদের সন্তানদের জীবন নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলার বিচার চাই।’
আরেক ভুক্তভোগী মা ফাতেমা বেগম অশ্রুসজল চোখে বলেন, ‘অপরিষ্কার কাঁচি আর নোংরা সুতা দিয়ে সেলাই করা হয়েছে। ব্যান্ডেজটাও ঠিকমতো করেনি। বাচ্চা প্রস্রাব করতে পারছে না, যন্ত্রণায় ছটফট করছে। সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখি ওই ভুয়া ডাক্তারদের কেউ নেই, সবাই পালিয়ে গেছে।’