ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশু আভানের মৃত্যু: ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বক্তব্য

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৩ পিএম

রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশু ওয়াইজ কুরুনী আভানের মৃত্যুর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘একপেশে, খণ্ডিত ও ভিত্তিহীন’ অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, শিশুটির চিকিৎসায় আন্তর্জাতিক ও জাতীয় গাইডলাইন অনুসরণ করা হয়েছে এবং তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার পর প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে চার বছর বয়সী ওয়াইজ কুরুনী আভান জ্বর, নাক দিয়ে রক্তপাত ও হেমোরেজিক ডেঙ্গু জ্বরের সন্দেহ নিয়ে হাসপাতালের বহির্বিভাগে (ওপিডি) আসে। সে সময় পিআইসিইউতে কর্তব্যরত সিনিয়র ডিউটি স্পেশালিস্ট (জুনিয়র কনসালট্যান্ট) ডা. নজরুল ইসলাম শিশুটিকে দেখেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি তাকে ঢাকা শিশু হাসপাতালের নবজাতক শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মাহফুজা শিরীনের অধীনে ভর্তি করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ভর্তির পর করা পরীক্ষায় শিশুটির শরীরে ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রতিদিন বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও CRP, Ferritin, Procalcitonin, SGPT ও SGOT-এর রিপোর্ট ডেঙ্গু এক্সটেন্ডেড সিনড্রোমের সঙ্গে ক্লিনিক্যালি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ১ অক্টোবর সন্ধ্যার পর থেকে শিশুটির ভাইটালস ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে। অধ্যাপক ডা. মাহফুজা শিরীন শিশুটিকে দেখে ক্লোজ মনিটরিংয়ের জন্য পিআইসিইউতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। তবে শিশুটির মা তখন পিআইসিইউতে নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন এবং ওয়ার্ডেই চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলেন।

পরদিন ২ অক্টোবর সকাল থেকে শিশুটির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। বিশেষ করে রক্তচাপ কমে যাওয়ায় ওয়ার্ডেই রক্তচাপ বাড়ানোর জন্য প্লাজমাসল ফ্লুইড দেওয়া হয়। দুপুর সাড়ে ১টার দিকে অধ্যাপক শিরীন আবারও শিশুটিকে দেখে দ্রুত পিআইসিইউতে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। পরে স্বজনরা রাজি হলে বিকেল ৪টায় তাকে পিআইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, পিআইসিইউতে নেওয়ার পর রক্তচাপ বাড়ানোর জন্য Hartsol, Plasmasol, Inj. Dobutamine ও Inj. Nor-Adrenaline দেওয়া হয়। অন্যান্য চিকিৎসাও চলতে থাকে। তবে শিশুটির অবস্থা আরও আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে।

৩ অক্টোবর সকাল থেকে তার অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। হাসপাতালের দাবি, শিশুটির মায়ের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলে যেকোনো সময় লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন হতে পারে বলে জানানো হয় এবং প্রতিবারই অবহিতকরণের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এ সময় Troponin-I ও Pro-BNP-এর মাত্রা বেশি থাকায় মায়োকার্ডাইটিসের সম্ভাবনা বিবেচনায় Inj. IVIG ও Inj. Methylprednisolone দেওয়া হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিবৃতিতে বলা হয়, ৩ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে শিশুটির শ্বাস-প্রশ্বাসের অবস্থার অবনতি হলে তাকে ভেন্টিলেটর দেওয়া হয় এবং সিভি লাইন করা হয়। এরপরও তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে সিপিআরের মাধ্যমে হৃদস্পন্দন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। সব ধরনের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেওয়ার পরও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ওই দিন বিকেল ৫টা ২ মিনিটে শিশুটির মৃত্যু হয়।

পরে শিশুটির মৃতদেহের সঙ্গে সব প্রিন্টেড ইনভেস্টিগেশন রিপোর্টের কপি ও ডেথ সার্টিফিকেট স্বজনদের দেওয়া হয় বলে দাবি করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল জানিয়েছে, তাদের এনআইসিইউ ও পিআইসিইউতে দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। দুটি ইউনিট স্বনামধন্য দুই অধ্যাপকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, এমডি ও এফসিপিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক, দক্ষ নার্স, মেডিকেল অফিসার ও শিশু বিশেষজ্ঞ রেজিস্ট্রার দায়িত্ব পালন করেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও দাবি করেছে, আভানের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খণ্ডিত তথ্য প্রচার করে চিকিৎসকদের দায়ী করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমনকি ফেসবুকের মাধ্যমে হাসপাতালে ‘মব’ তৈরির ঘোষণাও দেওয়া হচ্ছে। এতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে দাবি করেছে তারা।

বিবৃতিতে বলা হয়, এ ধরনের প্রচারণার কারণে চিকিৎসকদের মধ্যে আইনি ও সামাজিক ভীতি তৈরি হলে ‘ডিফেন্সিভ মেডিসিন’ চর্চা বাড়তে পারে। এতে সংকটাপন্ন রোগীদের জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারেন, যার চূড়ান্ত ক্ষতি সাধারণ মানুষ ও স্বাস্থ্যখাতকে বহন করতে হবে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে, একটি শিশুর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পুরো চিকিৎসাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কাম্য নয়। দেশের স্বাস্থ্যখাত ও চিকিৎসকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পদক্ষেপও দাবি করেছে তারা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত