বারবার সিদ্ধান্ত বদলে ‘অস্বস্তি’

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৩ এএম

দেশে সরকারি চাকরির বাজার এমনিতেই তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ। প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ সরকারি চাকরির জন্য পরীক্ষায় অংশ নেন। দীর্ঘ প্রস্তুতি, একাধিক ধাপের পরীক্ষা এবং বছরের পর বছর অপেক্ষার পর যখন নিয়োগের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছান, তখন কোনো সিদ্ধান্তে চাকরি হারানো কিংবা নিয়োগের নিয়ম হঠাৎ বদলে যাওয়ার আশঙ্কা চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে তৈরি করে চরম অনিশ্চয়তা। এমন বাস্তবতায় বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র আট মাসের মধ্যে চাকরি ও নিয়োগসংক্রান্ত একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কে পড়েছে। কোনো সিদ্ধান্তে আন্দোলন হয়েছে, কোনোটি নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। শেষ পর্যন্ত আন্দোলন বা সমালোচনার মুখে সরকারকে অবস্থান বদলাতেও হয়েছে।

চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চাকরি নিয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে বিসিএসে পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া প্রার্থীদের একটি অংশকে গেজেট থেকে বাদ দেওয়া, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে পুলিশ ভেরিফিকেশনে প্রার্থী বাদ দেওয়া, সরকারি চাকরির পরীক্ষায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কাঠামো পরিবর্তনের চিন্তা এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেওয়ার উদ্যোগ। এসব ঘটনায় চাকরিপ্রার্থী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক-স্নাতকোত্তর শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষাজীবন শেষ হলেও পড়াশোনার হাত থেকে রেহাই মেলে না চাকরিপ্রার্থীদের। দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে চাকরির বাজারে নিজেদের দক্ষতা পরীক্ষার লড়াইয়ে নামতে হয়। আগে প্রতিযোগিতা ছিল শ্রেণিকক্ষের সহপাঠীদের সঙ্গে, পরে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন চাকরি ও বিসিএসে তাদের প্রতিযোগিতা করতে হয় পুরো দেশের লাখ লাখ প্রার্থীর সঙ্গে। বিসিএসের ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া বেশ কঠিন। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক যেকোনো একটি ধাপ থেকে বাদ পড়া মানে নতুন করে পুরো জার্নি শুরু করা। একজন প্রার্থীকে একই সঙ্গে তিনটি ধাপে উত্তীর্ণ হতে হয়।

নিয়ম অনুযায়ী তিনটি ধাপে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের চাকরি পাওয়ার কথা থাকলেও এখানে যুক্ত হয় চতুর্থ ধাপ; যেখানে একজন প্রার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকে না, তাকে চোখ বন্ধ করে অপেক্ষা করতে হয় নিয়তির ওপর। এই ধাপের নাম ভ্যারিফিকেশন। সর্বশেষ বিসিএসসের গেজেট প্রকাশ হলে বিষয়টি ফের সামনে আসে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশে উত্তীর্ণ, কেউ কেউ ফলাফলে ছিলেন নিজ বিষয়ের শীর্ষে। অথচ দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে দেখা যায় গেজেটে ১ নম্বর বাদ দিয়ে ২ নম্বর দিয়ে শুরু হয়। স্বপ্ন ভেঙে খানখান হয়ে যায়। চারদিকে বয়ে যায় সমালোচনার ঝড়। চাকরিতে দলীয়করণ ও ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানি বন্ধের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেন শিক্ষার্থীরা।

বাদ পড়া কয়েকজন রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা না থাকার দাবি করে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের কেউ কেউ নিজ নিজ বিষয়ে মেধাক্রমে শীর্ষস্থানেও ছিলেন। ফলে পিএসসির সুপারিশের পরও কেন তাদের নিয়োগ দেওয়া হলো না এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

চাকরিপ্রার্থীদের অনেকে বলেছেন, পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও যদি ভেরিফিকেশনের নামে নিয়োগ আটকে যায়, তাহলে প্রার্থীদের কাছে পুরো প্রক্রিয়াটিই প্রহসন মনে হয়। বিশেষ করে বাদ দেওয়ার কারণ প্রকাশ না করায় বিষয়টি আরও অস্পষ্ট হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে।

জানা যায়, ৪৯তম (বিশেষ) বিসিএসে পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া ৬৬৮ জনের মধ্যে ৬১১ জনকে নিয়োগ দিয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বাদ পড়েন ৫৭ জন। বাদ পড়া আরও ৪০ জনকে নিয়োগ দিয়ে সোমবার (৫ অক্টোবর ২০২৬) রাতে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। এর আগে গত ২ অক্টোবর পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন সোমবার জারির প্রক্রিয়া চলছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ না থাকলে শুধু পুলিশ বা গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাকে নিয়োগবঞ্চিত করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। এই বিষয়টি নিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের আরও ভাবতে হবে।

এর আগে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের ফল প্রকাশের পর পুলিশ ভেরিফিকেশনে প্রায় ২ হাজার  প্রার্থী বাদ পড়ার ঘটনায় ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর নিয়োগ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা এসব প্রার্থী ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন। রাস্তা অবরোধ, স্মারকলিপি প্রদান থেকে শুরু করে অনশন কর্মসূচিও পালন করেন তারা। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগের জন্য নির্বাচিত হওয়ার পরও ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে।

পরিস্থিতি একপর্যায়ে এমন পর্যায়ে যায় যে, সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখার ঘোষণা দেয়। পরে বাদ পড়া প্রার্থীদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে।

দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএর মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগের ব্যবস্থা চলে আসছে। এই ব্যবস্থায় নিবন্ধন পরীক্ষা, মেধাক্রম এবং শূন্য পদের বিপরীতে প্রার্থী নির্বাচনের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে গত ৩ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ ম্যানেজিং কমিটির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা গেলে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। এতে নিয়োগে তদবির, স্বজনপ্রীতি ও অর্থের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তারা। বিষয়টি নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ ও আন্দোলন শুরু হলে শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ঘোষণা দেন এনটিআরসিএর মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়ার যে প্রক্রিয়া, সেটাই অব্যাহত থাকবে।

একটি সিদ্ধান্তের পর তা বদলের এমন বিতর্কের মধ্যেই সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। ভাইভা পরীক্ষায় নম্বর বাড়িয়ে লিখিত পরীক্ষায় নম্বর কমানোর বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে বলে জানা যায়। মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং এর আওতাধীন দপ্তর-সংস্থায় ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে (তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি) জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর সমান (৫০-৫০) করা হচ্ছে। প্রক্সি পরীক্ষা বা জালিয়াতি রোধের যুক্তি দেখিয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় এ সংক্রান্ত একটি বিধিমালার অনুমোদন দেওয়া হয়।

সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত না হলেও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে এরই মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন লিখিত পরীক্ষার মতো তুলনামূলক কাঠামোবদ্ধ ও প্রতিযোগিতামূলক ধাপের নম্বর কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানো হলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, এটি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে বা বৈষম্য সৃষ্টির জন্য নয়, বরং দক্ষ-যোগ্য প্রশাসনিক জনবল নিশ্চিত করতেই সরকার এই পরিবর্তন এনেছে। একই সঙ্গে নিয়োগ পরীক্ষার মৌখিক পরীক্ষায় (ভাইভা) বেশি নম্বর রাখার সিদ্ধান্তকে নিয়োগের মানোন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতায় একজন প্রার্থী বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন। একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত অনেক সময় একাধিক বছর লেগে যায়। ফলে মাঝপথে নিয়ম পরিবর্তন কিংবা চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে কোনো সিদ্ধান্তে পরিবর্তন চাকরিপ্রার্থীদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। শুধু চাকরির সুযোগ নয়, তাদের সময়, অর্থ ও মানসিক শ্রমও এর সঙ্গে জড়িত।

দেশে বেকার তরুণের সংখ্যা যখন বড় উদ্বেগের বিষয়, তখন সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্থিতিশীলতা ও আস্থা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, নিয়োগের নিয়ম পরিবর্তনের আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা এবং সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই করা দরকার। তা না হলে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আন্দোলন শুরু হলে সরকারকে আবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়, যা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

শিক্ষাবিদদের মতে, সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে যৌক্তিকতা থাকতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সেটি চাকরিপ্রার্থী, নিয়োগকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে নিয়োগের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে হঠাৎ সিদ্ধান্ত এবং পরে তা প্রত্যাহার করা হলে তরুণদের মধ্যে হতাশা ও অবিশ্বাস তৈরি হয়।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমান সময়ে তরুণদের বড় একটি অংশের প্রধান প্রত্যাশা একটি স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা। পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতা প্রমাণ করার পরও যদি রাজনৈতিক পরিচয়, ভেরিফিকেশন বা নিয়োগপদ্ধতির পরিবর্তনের কারণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার ওপর আস্থা কমতে পারে। তরুণদের সঙ্গে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া সরকারের জন্যও ইতিবাচক বার্তা নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাকরি ও নিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের মুখে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত