মানিকগঞ্জ

নিষেধাজ্ঞার প্রথম দিনেই পদ্মায় মাছ শিকার

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৯ পিএম

ইলিশের নিরাপদ প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে ২২ দিনের জন্য দেশের নদ-নদীতে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা, বিক্রি, পরিবহন ও মজুদ নিষিদ্ধ। তবে নিষেধাজ্ঞার প্রথম দিনেই মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে পদ্মা নদীর আন্ধারমানিক ঘাটে জেলেদের মাছ শিকার ও বিক্রি করতে দেখা গেছে। নিষেধাজ্ঞার গুরুত্বপূর্ণ প্রথম প্রহরে ঘাটে মৎস্য বিভাগের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তদারকিতে দেখা যায়নি। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, মৎস্য বিভাগের নজরদারি না থাকায় জেলেরা নদী থেকে মাছ ধরে ঘাটে এনে বিক্রি করেছেন।

আজ ভোর ৫টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত আন্ধারমানিক ঘাটে সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকজন জেলে নদী থেকে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরে ঘাটে নিয়ে আসছেন। সেখানে প্রকাশ্যে ইলিশ বিক্রি করতে দেখা না গেলেও অন্যান্য মাছের কেনাবেচা চলছিল। ঘাটের মাছের আড়তেও ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি ছিল।

এ সময় এক ক্রেতা এক জেলের কাছে ইলিশ মাছ আছে কি না জানতে চাইলে ওই জেলে ইলিশ থাকার কথা জানান। গোপন জায়গায় রাখা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি চাইলে মাছ এনে দিতে পারবেন বলেও জানান। পরে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে ওই জেলে কথাটি অস্বীকার করে সেখান থেকে চলে যান। ফলে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর ভোরের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ঘাটে মৎস্য বিভাগের তদারকি না থাকায় মাছ ধরা ও বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। মাছ বিক্রির কার্যক্রম প্রায় শেষ হওয়ার পর সকাল ৮টা ২০ মিনিটের দিকে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে ঘাটে দেখা যায়। পরে জেলা মৎস্য কর্মকর্তাও সেখানে পরিদর্শনে আসেন।

মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মানিকগঞ্জের পদ্মা, যমুনাসহ বিভিন্ন নদ-নদীতে বিপুলসংখ্যক জেলে মাছ ধরার সঙ্গে জড়িত। জেলার বড় ১০ থেকে ১২টি ঘাটকে কেন্দ্র করে প্রায় ১৬ হাজার মানুষ জেলে পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত। জেলার ৮০ কিলোমিটারের বেশি নদীপথে ইলিশের বিচরণ রয়েছে বলে জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ।

নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকারি সহায়তা নিয়েও জেলেদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, প্রকৃত জেলেদের অনেকে সরকারি বরাদ্দের ২৫ কেজি চাল পাচ্ছেন না। জেলে কার্ড বিতরণ নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ।

স্থানীয় জেলে হারুণ খন্দকার বলেন, ‘২৫ কেজি চালে কী হয়? একটা বাড়িতে পাঁচ-সাতজন মানুষ থাকলে এই চাল দিয়ে কতদিন চলবে? জিনিসপত্রের যে দাম, শুধু চাল খেয়ে তো থাকা যায় না। আমি একাই পরিবার চালাই। মাছ না ধরলে খাব কী? সরকারের উচিত জেলেদের দিকে একটু নজর দেওয়া এবং সহায়তার পরিমাণ বাড়ানো।’

আরেক জেলে মোমেজ উদ্দিন বলেন, ‘১৫ বছর ধরে এই নদীতে মাছ মারি। আজ পর্যন্ত পাঁচ কেজি চালও পাইনি। এই কয়দিন খুব কষ্ট করে চলতে হয়। লুকিয়ে-চুরিয়ে কয়েকটা ছোট মাছ ধরে এনে ৫০০ টাকা বিক্রি করি। কোনো রকমে ছেলেমেয়ে নিয়ে খেয়ে বেঁচে থাকতে হয়।’

তবে নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইলিশ সংরক্ষণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন হরিরামপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নুরুল ইকরাম। তিনি বলেন, ‘ঝিটকা আড়ৎসহ বিভিন্ন আড়ত আমরা পরিদর্শন করেছি। ইলিশ মাছ আছে কি না, সেটিই আমাদের মূল অগ্রাধিকার। যদিও নিয়ম অনুযায়ী ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ। এখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও দরিদ্র জেলেরা রয়েছেন—তাঁদের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। জেলে কার্ড বিতরণ নিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সকাল থেকেই বিভিন্ন জায়গায় পরিদর্শন করছি। নিষেধাজ্ঞার সময়ে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ। আজকের বিষয়টি যদি এমন হয়ে থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরপর থেকে এমনটি আর হবে না। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে ২৪ ঘণ্টা অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত অব্যাহত থাকবে।’

সচেতন মহলের মতে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হলে শুধু দিনের বেলায় নয়, ভোর ও রাতেও নদী এবং মাছের ঘাটগুলোতে নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত জেলেদের তালিকা যাচাই করে সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় জীবিকার তাগিদে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাছ ধরার প্রবণতা বন্ধ করা কঠিন হবে।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত