সিনিয়র তথ্য অফিসার
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়
সকালে নাশতার টেবিলে একটি ডিম। দেখতে সাধারণ, কিন্তু পুষ্টিমান ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের বিচারে অসাধারণ। শিশুর বেড়ে ওঠা, কিশোরের শারীরিক বিকাশ, কর্মজীবী মানুষের দৈনন্দিন পুষ্টি কিংবা বয়স্ক মানুষের সুস্থ জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ডিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সহজলভ্যতা, রান্নার বহুমুখিতা এবং সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে ডিম বিশ্বজুড়ে প্রাণিজ প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
প্রতি বছর অক্টোবরের দ্বিতীয় শুক্রবার পালিত হয় বিশ্ব ডিম দিবস। এ বছর বিশ্ব ডিম দিবসের ৩০তম বার্ষিকী। এবারের প্রতিপাদ্য ‘শক্তি জোগায়, সুরক্ষা দেয় যে প্রোটিন’ (প্রোটিন দ্যাট পাওয়ারস অ্যান্ড প্রটেক্টস)। ১৯৯৬ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় বিশ্ব ডিম দিবসের সূচনা হয়। তিন দশক ধরে দিবসটি পুষ্টিমান, বহুমুখী ব্যবহার ও খাদ্য-নিরাপত্তায় ডিমের ভূমিকা নিয়ে বৈশ্বিক সচেতনতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে।
ডিমের সবচেয়ে বড় শক্তি এর পুষ্টিমান। এতে উচ্চমানের প্রোটিন রয়েছে, যাতে শরীরের প্রয়োজনীয় নয়টি অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড পাওয়া যায়। পেশি গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণ, কোষের বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ এবং দৈনন্দিন শারীরিক কর্মকাণ্ডে এ প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ।
প্রোটিনের পাশাপাশি ডিমে রয়েছে কোলিন, ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন ডি, সেলেনিয়াম, রিবোফ্লাভিন, ফসফরাস, ফোলেট, ভিটামিন এ, আয়রন ও জিংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। কোলিন মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। ভিটামিন বি-১২ রক্তকণিকা ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয়।
শিশুদের খাদ্যতালিকায়ও ডিমের গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) বলছে, ছয় থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য থাকা প্রয়োজন এবং মাংস, মাছ বা ডিমের মতো প্রাণিজ উৎসের খাবার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। হু-এর তথ্য অনুযায়ী ডিম ও অন্যান্য প্রাণিজ খাদ্যগ্রহণের সঙ্গে প্রোটিন, ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন ডি, ফসফরাস ও সেলেনিয়ামসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান বেশি গ্রহণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে ডিম কোনো একক ‘সমাধান’ নয়; এটি সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকার একটি অংশ। এবারের দিবসের আয়োজনেও এই পুষ্টি বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ডিমের গল্প শুধু পুষ্টির নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষি অর্থনীতি, উদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ জীবিকা। বাংলাদেশে ডিম উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১৫ কোটি। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ২৫ কোটি ৪১ লাখে উন্নীত হয়েছে। বছরে মাথাপিছু ১০৪টি ডিমের চাহিদার বিপরীতে প্রাপ্যতা দাঁড়িয়েছে ১৪১টিতে। এই অগ্রগতির পেছনে সরকার ও খামারিসহ অন্যদের ভূমিকা রয়েছে।
একটি ডিম ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগে পেরিয়ে আসে দীর্ঘ একটি মূল্য-শৃঙ্খল। খামারে মুরগি পালনের জন্য প্রয়োজন বাচ্চা, ফিড, ওষুধ ও টিকা। এরপর ডিম সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা বিপণন প্রতিটি ধাপেই তৈরি হয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থান। এ কারণে ডিমের দাম নিয়ে আলোচনা শুধু ভোক্তার ব্যয়ের হিসাব দিয়ে শেষ করা যায় না। এর সঙ্গে খামারির উৎপাদন ব্যয় ও ন্যায্যমূল্য পাওয়ার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফিড, বিদ্যুৎ, জ¦ালানি, বাচ্চা ও ওষুধের দাম, রোগবালাই এবং বাজার-ব্যবস্থাপনা সবকিছুই ডিমের উৎপাদন ব্যয়কে প্রভাবিত করে। প্রান্তিক পর্যায়ের মৎস্য খামার ও হ্যাচারি এবং গবাদিপশু ও পোলট্রি খামারের উৎপাদন ব্যয় কমাতে বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ রিবেট দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট চারটি খাতে ১০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ বিভাগ। সরকার উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি স্থিতিশীল সরবরাহ ব্যবস্থা, স্বচ্ছ বাজার এবং কার্যকর মূল্য-শৃঙ্খল গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে।
উৎপাদন বাড়লেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ডিম হতে হবে নিরাপদ ও মানসম্মত। খামারে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, নিরাপদ খাদ্য ও পানি, রোগ নিয়ন্ত্রণ, যথাযথ টিকাদান এবং বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করা জরুরি। খামার থেকে বাজার পর্যন্ত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনেও স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। উন্নত জাত, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, সুষম ও সাশ্রয়ী ফিড, রোগ প্রতিরোধ, বায়োসিকিউরিটি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের টিকিয়ে রাখা জরুরি। প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ডিম উৎপাদনের অবদান আরও বাড়বে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও উৎপাদনের পাশাপাশি উদ্ভাবন ও জ্ঞানবিনিময়ের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
দেশে ডিমের উৎপাদন বাড়ায় সরকার রপ্তানির দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য খাদ্যনিরাপত্তা, মাননিয়ন্ত্রণ, রোগমুক্ত উৎপাদন, প্যাকেজিং, কোল্ড চেইন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। আর এ লক্ষ্য অর্জনে গত ২৮ জুন নাইজেরিয়ায় প্রথমবারের মতো হ্যাচিং এগ রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ যা এ খাতে আশার সঞ্চার করেছে।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাশ্রয়ী প্রাণিজ প্রোটিনের গুরুত্ব অনেক। ডিম এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর খাদ্যতালিকায় সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে ডিমের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
কানাডায় স্থানীয় কমিউনিটিতে ডিম দানের উদ্যোগ চলছে। নাইজেরিয়ায় শিশুদের মধ্যে তিন হাজার সেদ্ধ ডিম বিতরণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র পোলট্রি খামারিদের প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তাদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ডিমকে পুষ্টি, সামাজিক সহায়তা এবং জীবিকার সঙ্গে একসঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ায় এবার ৩০ বছরের বিশ্ব ডিম দিবসকে ৩০টি রেসিপি ও ডিম খাওয়ার ৩০টি পুষ্টিগত কারণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এতে ডিমের পুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতার পাশাপাশি দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে এর বহুমুখী ব্যবহার তুলে ধরা হচ্ছে।
বাংলাদেশেও এমন উদ্যোগের স্থানীয় সংস্করণ নেওয়া যেতে পারে। ভাত, রুটি, খিচুড়ি কিংবা সবজির সঙ্গে সহজে যুক্ত করা যায় বলে ডিমের পুষ্টিমান সম্পর্কে পরিবারভিত্তিক সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব। স্কুল, কমিউনিটি, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে ডিমের ব্যবহার সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক প্রচারণা চালানো যেতে পারে।
বিশ্ব ডিম দিবস তাই শুধু একটি খাদ্যকে জনপ্রিয় করার দিন নয়। এটি পুষ্টি, কৃষি অর্থনীতি, খামারির জীবিকা, নিরাপদ খাদ্য, কর্মসংস্থান এবং খাদ্যনিরাপত্তাকে একই সূত্রে দেখার একটি সুযোগ।
বাংলাদেশ ডিম উৎপাদনে যে সক্ষমতা অর্জন করেছে, এখন সেই সক্ষমতাকে আরও দক্ষ, নিরাপদ ও টেকসই পর্যায়ে নেওয়ার সময়। উৎপাদন থেকে উৎপাদনশীলতা, কাঁচাপণ্য থেকে মূল্য সংযোজন, খামারি থেকে ভোক্তা পুরো ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে পারলে ডিম শুধু একটি খাদ্যপণ্য হিসেবে নয়, দেশে পুষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবেও আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।