এসএম সুলতানের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

শিল্পীর ২৩টি দুর্লভ চিত্রকর্ম থাকলেও জায়গার অভাবে প্রদর্শন করা যাচ্ছে না সব ছবি।

আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০০ এএম

আজ শনিবার (১০ অক্টোবর), বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৪ সালের এই দিনে অসুস্থতাজনিত কারণে যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে অসংখ্য ভক্তের মনে। পরে চিত্রা নদীর পাড়ে সবুজ-শ্যামল ছায়াঘেরা নিজ বাসভবনের উত্তর পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।

শিল্পী এস এম সুলতানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কোরআন খতম, শিল্পীর সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন, দোয়া ও মোনাজাত, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা এবং পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান।

১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল শহরের মাছিমদিয়ায় এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এস এম সুলতান। তার বাবা মেছের আলী ও মা মাজু বিবি আদর করে নাম রেখেছিলেন লাল মিয়া। আর্থিক অভাব-অনটনের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বেশি দূর এগোতে পারেননি তিনি। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার পরই তার স্কুলজীবনের ইতি ঘটে। এরপর বাবার সঙ্গে রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। তবে ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ছিল। বাবার সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি দালানকোঠার ছবি আঁকতেন তিনি।

১৯৩৮ সালে কলকাতার আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়ে প্রায় তিন বছর চিত্রকলার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন এস এম সুলতান। পরে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই বেরিয়ে পড়েন। পাকিস্তান, কাশ্মীর, যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন তিনি। ভ্রমণ ও নিরন্তর সাধনার মধ্য দিয়ে নিজেকে বিশ্বমানের চিত্রশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

জীবদ্দশায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে তার চিত্রকর্মের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে এসব দেশে বেশ কয়েকটি একক ও যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নেন তিনি। দেশের ভেতরে ঢাকা ও নড়াইলেও তার বিখ্যাত চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হয়। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এবং ১৯৮৭ সালে গ্যেটে ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত প্রদর্শনীগুলো তার খ্যাতি ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এস এম সুলতানের চিত্রকর্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রামীণ জীবন এবং পেশিবহুল, শক্তিশালী কৃষকসমাজের প্রতিচ্ছবি। তাঁর উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্মের মধ্যে রয়েছে ‘চর দখল’, ‘ধান কাটা’, ‘পাট কাটা’, ‘কৃষকের সংগ্রাম’ ও ‘আমার গ্রাম’। চিত্রকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮২ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন তিনি। এ ছাড়া দেশ-বিদেশে অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন এই কিংবদন্তি শিল্পী।

১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর এস এম সুলতানের মৃত্যুর পর তার স্মৃতি সংরক্ষণে ২০০৩ সালে প্রায় এক একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয় স্মৃতি সংগ্রহশালা ও শিশুস্বর্গ। এ ছাড়া তার নামে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি আর্ট কলেজ। শিশুস্বর্গে বর্তমানে সপ্তাহে দুই দিন শিশুদের ছবি আঁকা শেখানো হয়। শিল্পী এস এম সুলতানের মতো চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ছবি আঁকা শিখছে কোমলমতি শিশুরা। তার প্রতিষ্ঠিত শিশুস্বর্গে কাজ করতে পেরেও সন্তুষ্ট শিক্ষকেরা।

এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত রয়েছে শিল্পীর আঁকা দুর্লভ কিছু ছবি ও তার ব্যবহার্য জিনিসপত্র। এসব চিত্রকর্ম ও শিল্পীর বাসভবন দেখতে এবং তার সম্পর্কে জানতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা নড়াইলে আসেন। চিত্রা নদীর পাড়ের সবুজ-শ্যামল ছায়াঘেরা পরিবেশও তাদের আকৃষ্ট করে। তবে সংগ্রহশালার আয়তন ও পরিসর কম হওয়ায় অনেক দর্শনার্থীই প্রত্যাশা অনুযায়ী ঘুরে দেখতে পারেন না। এ কারণে আশপাশের জমি অধিগ্রহণ করে এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালাকে পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করার দাবি জানিয়েছেন দর্শনার্থীরা।

এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালার কিউরেটর তন্দ্রা মুখার্জী জানান, বর্তমানে সংগ্রহশালায় শিল্পী সুলতানের ২৩টি দুর্লভ চিত্রকর্ম এবং ৫৩টি প্রতিরূপ রয়েছে। শিল্পীর আরও চিত্রকর্ম থাকলেও জায়গার অভাবে সেগুলো প্রদর্শন করা সম্ভব হচ্ছে না। সংগ্রহশালাটি সম্প্রসারণের জন্য জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে ফাইলবন্দি হয়ে রয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে সংগ্রহশালার পরিসর বাড়বে এবং এটি আরও পর্যটকবান্ধব হয়ে উঠবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত