রাজমন্দিরে ১৬০ প্রতিমায় জীবন্ত রামায়ণ-মহাভারত

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৯ পিএম

মণ্ডপে ঢুকলেই যেন খুলে যায় পৌরাণিক কাহিনির একেকটি পাতা। কোথাও পৌরাণিক যুদ্ধ, কোথাও বীরত্বের কাহিনি, আবার কোথাও তুলে ধরা হয়েছে দেব-দেবীর নানা গল্প। মণ্ডপজুড়ে এমন অসংখ্য কাহিনির সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়েছে ১৬০টি প্রতিমা। ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি শিল্প ও পৌরাণিক গল্পের এই ব্যতিক্রমী মেলবন্ধন ঘটেছে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার কবুতরখালী গ্রামের রাজমন্দিরে।

ব্যতিক্রমী এই আয়োজন ঘিরে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার কবুতরখালী গ্রামের রাজমন্দিরে চলছে দুর্গাপূজার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।

আয়োজকদের দাবি, বরিশাল বিভাগের অন্যতম বড় দুর্গাপূজার আয়োজন হতে যাচ্ছে এবার রাজমন্দিরে। বিশাল প্রাঙ্গণজুড়ে তৈরি হচ্ছে প্যান্ডেল। সেখানে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হচ্ছে ১৬০টি প্রতিমা। এবারের মূল আকর্ষণ টেরাকোটা শিল্পের মাধ্যমে রামায়ণ ও মহাভারতের অসংখ্য কাহিনি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

টেরাকোটা মূলত পোড়ামাটির শিল্পকর্ম। বাংলার প্রাচীন মন্দির ও স্থাপত্যে পোড়ামাটির ফলক ও নকশার মাধ্যমে পৌরাণিক কাহিনি, লোকজ জীবন ও ঐতিহাসিক নানা ঘটনা তুলে ধরার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সেই শিল্পরীতির ভাবনাকেই এবারের দুর্গোৎসবের মূল থিম হিসেবে নিয়েছেন আয়োজকরা।

মঠবাড়িয়া উপজেলার গুলিসাখালী ইউনিয়নের কবুতরখালী গ্রামের হালদার বাড়িতে এই আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে প্রায় ছয় মাস ধরে।

প্রায় ২০ জন কারিগর ও শ্রমিক প্রতিমা নির্মাণের কাজে যুক্ত ছিলেন। প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি চলছে প্যান্ডেল, আলপনা, আলোকসজ্জা ও মণ্ডপের অন্যান্য সাজসজ্জার কাজ।

রাজমন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা অর্থোপেডিকস বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. সুদীপ কুমার হালদার বলেন, বাবার ইচ্ছা থেকেই এই পূজার আয়োজন শুরু হয়। বাবা চেয়েছিলেন, ছেলের বউ চিকিৎসক হলে বাড়িতে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হবে। সেই ইচ্ছাকে কেন্দ্র করেই পূজার সূচনা। দীর্ঘ সময় ধরে এই পূজা চলে আসছে। শুরুতে পারিবারিক পরিসরে আয়োজন করা হলেও মানুষের ভালোবাসা ও আগ্রহে ধীরে ধীরে এর পরিসর বাড়তে থাকে।

এবারের আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ টেরাকোটার কাজ উল্লেখ করে তিনি বলেন, রামায়ণ ও মহাভারতের বিভিন্ন কাহিনি ও চরিত্রকে এই শিল্পরীতির মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। আমরা প্রতিবছরই নতুনত্ব আনার চেষ্টা করি। পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক নানা কার্যক্রমও থাকবে। আমরা দর্শনার্থীদের জন্য রেখেছি বুক কর্নার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার।পাশাপাশি রয়েছে ‘মানবতার দেওয়াল’, চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা, স্যানিটারি প্যাড বিতরণ এবং দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তার উদ্যোগ। মন্দির প্রাঙ্গণ ও আশপাশে দেশের গুণীজনদের ছবি এবং বিভিন্ন উপদেশমূলক বাণীও প্রদর্শন করা হচ্ছে।

আয়োজকদের মতে, পূজাকে শুধু ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা ও মানবিক মূল্যবোধের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। পূজার পাঁচ দিন দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের খাবারের ব্যবস্থাও থাকবে বলে জানিয়েছে মন্দির কর্তৃপক্ষ। প্রতিবছর তিন থেকে চার লাখ মানুষ এই পূজায় আসে। এ বছরও চার থেকে পাঁচ লাখ মানুষ আগমনের প্রত্যাশা তাদের।

রাজমন্দির দেখভালের দায়িত্বে থাকা পলাশ চন্দ্র গাইন বলেন, গত বছরে নয়া দিল্লি, কলকাতা, জাপান, চীন, আমেরিকা ও ইংল্যান্ড থেকে পর্যটকরা এখানে এসে এ মন্দির সম্পর্কে নোট বুকে মন্তব্য করে গেছেন। এজন্য আমরা ধন্য।

প্রতিমা নির্মাণশিল্পী উজ্জ্বল বিশ্বাস গুরু জানান, কয়েক মাস ধরে কাজ করে প্রতিমা নির্মাণের কাজ শেষ করেছেন তারা। প্রায় চার থেকে পাঁচ মাসের পরিশ্রমে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করেছি। এতো বড় আয়োজন তার জানা মতে আর কোথাও হচ্ছে না। বড় এই আয়োজনের সঙ্গে থাকতে পেরে তিনি আনন্দিত।

পূজা শুরুর আগেই রাজমন্দিরের আয়োজন দেখতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। শুধু পিরোজপুর নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ ছুটে আসছেন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি দেখতে।

পাশের জেলা ঘুরতে আসা বরগুনা থেকে আসা তন্ময় মিত্র বলেন, পরিবার নিয়ে প্রতিবারই আসা হয়। এখন আসলাম আয়োজনটা ঘুরে দেখতে। এবারে এসে দেখলাম নতুন থিম। এখানে প্রতিবারের নতুনত্ব থাকে আয়োজনে।

পিরোজপুরের সাত উপজেলায় এবার ৪৬২টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। পূজাকে ঘিরে জেলার প্রতিটি মণ্ডপে পৃথক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ। পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তালেবুর রহমান।

২০১০ সালে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই আয়োজন ২০১৬ সালে ৪৪টি প্রতিমা দিয়ে আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। ২০১৮ সালে প্রতিমার সংখ্যা বেড়ে ৪৫০-এ পৌঁছায়। এরপর প্রতিমার সংখ্যা কমিয়ে আনা হলেও প্রতিবছরই আয়োজনের সঙ্গে নতুন কোনো না কোনো বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে।

আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।  

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত