শুভ্র আঁশে টেকসই ভবিষ্যৎ

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৮ এএম

‘ভালোর জন্য তুলা : বাণিজ্য, রূপান্তর এবং অংশীদারত্বের মাধ্যমে সমৃদ্ধি অর্জন’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিগত কয়েক বছরের মতো এ বছরও পালিত হয়েছে বিশ্ব তুলা দিবস-২০২৬। এই বৈশ্বিক উদযাপনের উদ্দেশ্য হলো, বাণিজ্যিক নিশ্চয়তা, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই চাষাবাদ এবং কাপড়ে রূপান্তরের মাধ্যমে তুলা চাষি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। আমাদের মৌলিক চাহিদাগুলো হলো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা। সভ্যতার দিক থেকে বিবেচনায় বস্ত্রই হচ্ছে আমাদের প্রথম মৌলিক চাহিদা। এই বস্ত্রশিল্পের মূল ও প্রধান উপাদান শুভ্র আঁশ বা তুলা। বাংলাদেশে তুলা চাষের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়কাল (১৯৭৫-১৯৮১) একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ১৯৭৬ সালে তার সরকারের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চফলনশীল ও উন্নত জাতের ‘ডেল্টাপাইন’ তুলার বীজ আমদানি করা হয়, যা দেশে বাণিজ্যিক তুলা চাষের আনুষ্ঠানিক গতিবেগ বৃদ্ধি করে। এছাড়া তার সরকারের দেশব্যাপী সেচ সম্প্রসারণ কর্মসূচি শুষ্ক মৌসুমে তুলার মতো অর্থকরী ফসল চাষের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে বস্ত্র খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।

বর্তমানে বস্ত্র এবং গার্মেন্টস খাত বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। বাংলাদেশে বস্ত্র খাতের ৫২৬টি সুতাকলের জন্য বছরে প্রায় ৮০-৮৫ লাখ বেল আঁশ তুলার প্রয়োজন হয়, যার ৯৬% থেকে ৯৭% বিদেশ থেকে আমদানি করে মেটানো হচ্ছে এবং এই চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিমাণ তুলা আমদানি করতে প্রতি বছর প্রায় ৩৫-৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তুলা আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৩৪৫ কোটি ডলার। বর্তমানে আমাদের দেশে চাহিদার মাত্র তিন ভাগ পূরণ করতে পারি। ৫০০০ গার্মেন্টস ও তৈরি পোশাকের অন্যান্য খাতে প্রায় ৫০ লাখ লোক সরাসরি জড়িত। এসব বিবেচনায় বিশ্ব তুলা দিবস বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে, ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় এসেছে বস্ত্র খাত থেকে। অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ৮০.৬২ ভাগই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এক টন তুলা গড়ে পাঁচজনকে প্রায় বছরব্যাপী কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়। কৃষি ফসলের মধ্যে তুলাই একমাত্র ফসল, যা থেকে খাদ্য ও বস্ত্র দুই-ই পাওয়া যায়। বীজতুলা থেকে প্রথমত আমরা আঁশ পেয়ে থাকি, এ ছাড়া উপজাত হিসেবে বিশ্বে প্রতি বছর পাঁচ কোটি টনেরও বেশি তুলাবীজ উৎপাদিত হয়। তুলাবীজ থেকে আমরা ভোজ্য তেল ও খৈল পেয়ে থাকি। খৈল গবাদি পশু ও মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক গুরুত্বের বিচারে এবং উৎপাদন থেকে ব্যবহারে তুলা সবার জন্য উপযোগী ও টেকসই করার জন্য বিশ্ব তুলা দিবস ২০২৬ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বে তুলা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। প্রতি বছর ২৯.৫-৩৩.৩ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে বিশ্বের গ্রীষ্মম-লীয় ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের সত্তরটিরও বেশি দেশের তুলা চাষ করা হয়, যা সব পৃথিবীর আবাদ করা জমির ২ দশমিক ৫ শতাংশ। ১০০ মিলিয়নেরও বেশি পরিবার সরাসরি তুলা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত এবং ২৫-২৬ মিলিয়ন টন কাঁচা তুলা উৎপাদন করে, যেখানে প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ৮০০ কেজি আঁশতুলা উৎপাদিত হয়। কৃষি ফসলের মধ্যে অনন্য হলো তুলা। বীজতুলা থেকে প্রথমত আমরা আঁশ পেয়ে থাকি, এ ছাড়া উপজাত হিসেবে বিশ্বে প্রতি বছর পাঁচ কোটি টনেরও বেশি তুলাবীজ উৎপাদিত হয়। তুলাবীজ থেকে আমরা ভোজ্য তেল ও খৈল পেয়ে থাকি। খৈল গবাদি পশু ও মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশ্ব তুলা দিবস প্রতিষ্ঠার জন্য তুলা উৎপাদনকারী চার দেশ বেনিন, বুরকিনা ফাসো, চাদ এবং মালি ২০২০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়। সে মোতাবেক জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০ আগস্ট, ২০২১ আনুষ্ঠানিকভাবে ৭ অক্টোবরকে বিশ্ব তুলা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বজুড়ে তুলার বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবকে স্বীকার করে এবং স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘ বিশ্ব তুলা দিবস ঘোষণা করে এবং এটি জাতিসংঘের স্থায়ী ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর পর থেকে প্রতি বছর ৭ অক্টোবর, তুলার গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী তুলে ধরার জন্য বিশ্ব তুলা দিবস পালন করা হচ্ছে।

তুলাচাষিদের পণ্যের সঠিক মূল্য ও আন্তর্জাতিক বাজার নিশ্চিত, কাঁচা তুলাকে উচ্চমূল্যের তৈরি পোশাকে রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বেসরকারি খাতের মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে তুলে তুলা শিল্পে বড় বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার ঘটবে। বিপজ্জনক রাসায়নিক ও পানির ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই তুলা চাষের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করা এবং কার্বন মার্কেটের সুবিধা কাজে লাগিয়ে তুলাচাষিদের জন্য জলবায়ু তহবিল থেকে বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে দারিদ্র্যবিমোচন করা বিশ্ব তুলা দিবসের উদ্দেশ্য। তুলা উৎপাদন, জিনিং, টেক্সটাইল, গার্মেন্ট, ভোজ্য তেল এবং সাবানশিল্প ইত্যাদির মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। তুলা বিশ্বের অন্যতম টেক্সটাইল তন্তু এবং তুলা অর্থনৈতিক ও সামাজিক কল্যাণে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। বাংলাদেশে ও কটন কানেক্টের সহযোগিতায় টেকসই তুলা উৎপাদন শুরু হয়েছে। তুলা পৃথিবীর অনেক দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে মূল ভূমিকা পালন করে যে কারণে এটি বিশ্বের অনেক দেশের কাছে ‘হোয়াইট গোল্ড’ হিসেবে পরিচিত। অনুরূপভাবে, বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক গুরুত্বের বিচারে বিশ্ব তুলা দিবস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত