বর্ষার টানা বৃষ্টি আর মেঘলা দিনের অবসান ঘটিয়ে প্রকৃতি যখন ধীরে ধীরে নতুন রূপে সাজতে শুরু করে, তখনই বোঝা যায় শরৎ এসেছে। আকাশের নীল যেন আরও গভীর হয়, সাদা মেঘেরা ভেসে বেড়ায় আপন মনে। ভোরের ঘাসে জমে থাকা শিশির, মৃদু বাতাস আর কোমল রোদে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক নির্মল আবেশ। তবে শরতের আগমনী বার্তা সবচেয়ে আপন করে জানায় যে ফুল, তার নাম শিউলি।
শরতের ভোর মানেই যেন শিউলির ঘ্রাণ। রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে ফুটে ভোর হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে ছোট ছোট শিউলি। উঠান, বাগান কিংবা গাছের নিচে সাদা পাপড়ি আর কমলা বোঁটার ফুলগুলো ছড়িয়ে থাকে। শিশিরভেজা মাটির ওপর পড়ে থাকা শিউলিগুলো দেখে মনে হয়, রাতের আকাশ থেকে কেউ একমুঠো ছোট ছোট তারা ছড়িয়ে দিয়েছে। ভোরের বাতাসে তার মিষ্টি সুবাস মিশে চারপাশকে করে তোলে আরও স্নিগ্ধ। হাতে তুলে নেওয়া কয়েকটি শিউলি যেন শরতের সকালটাকেই মুঠোয় ধরে রাখার মতো অনুভূতি দেয়। দুধসাদা পাপড়ি ও কমলা-হলুদ বোঁটার মিষ্টি সুগন্ধময় শিউলি ফুলে রবীন্দ্রনাথও মুগ্ধ ছিলেন। এর রহস্যে অভিভূত হয়ে তিনি লিখেছেন, “শিউলি ফুল, শিউলি ফুল/ কেমন ভুল, এমন ভুল।/ রাতের বায় কোন্ মায়ায়/ আনিল হায় বনছায়ায়,/ ভোরবেলায় বারে বারেই/ ফিরিবারেই হলি ব্যাকুল।// কেন রে তুই উন্মনা/ নয়নে তোর হিমকণা?/ কোন্ ভাষায় চাস বিদায়,/ গন্ধ তোর কী জানায়,/ সঙ্গে হায় পলে পলেই/ দলে দলেই যায় বকুল।”
শিউলির পাশাপাশি শরতের আরেক পরিচিত সৌন্দর্য কাশফুল। নদীর পাড়, মাঠের ধারে কিংবা গ্রামের মেঠোপথের পাশে সারি সারি কাশ বাতাসে দুলতে থাকে। শরতের দিন যত এগোয়, প্রকৃতির রূপও তত বদলায়। সকালে শিউলির সুবাস, দুপুরে নীল আকাশের নিচে সাদা মেঘের ভেলা আর বিকেলে সোনালি রোদের মায়া প্রতিটি সময়ের রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। সন্ধ্যা নামলে চারপাশে নেমে আসে শান্তি। এর মধ্যেই কোথাও উৎসবের প্রস্তুতি, কোথাও পূজার আগমনী ব্যস্ততা শরতের আবহে যোগ করে নতুন আনন্দ।
শিউলি খুব বেশিদিন থাকে না। কিছুদিন পর গাছের নিচে সাদা ফুলের সেই বিছানা আর দেখা যায় না। শরৎ যেন প্রকৃতির লেখা এক ছোট্ট কবিতা যার প্রথম পঙ্ক্তিতে থাকে শিউলির সুবাস, আর শেষটুকু জুড়ে থাকে কাশফুলের শুভ্রতা।
শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ