ক্যাম্পাসে গিয়ে অবরুদ্ধ নতুন উপাচার্য

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৯ এএম

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে চলমান কমপ্লিট শাটডাউনের মধ্যে গতকাল সোমবার তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশ করেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। অনলাইনে যোগদানের ১৮ দিন পর তিনি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। এরপরই ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাকে ভেতরে রেখে উপাচার্য ভবনে তালা ঝুলিয়ে বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাত্মক অসহযোগ ও পূর্ণ কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

আগের উপাচার্যকে বহাল রাখার দাবিতে গত ২১ দিন ধরে ক্যাম্পাসে আন্দোলন করছে শিক্ষক-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এসে অবস্থান নেন নতুন উপাচার্য ড. শেখ শরীফুল আলম। আন্দোলনকারীরা ক্যাম্পাসে তাকে বয়কট ঘোষণা করলেও তিনি গতকাল সকাল পৌনে ৯টার দিকে হঠাৎ ক্যাম্পাসে উপস্থিত হয়ে উপাচার্য ভবনের তালা ভেঙে নিজ কার্যালয়ে প্রবেশ করেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে ছাত্রদলপন্থি কিছু বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীও ছিলেন। এই ভবনে আগে থেকেই তালা মেরে রেখেছিলেন আন্দোলনকারীরা।

এদিকে নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে ঢোকার খবর ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং দুপুর ১২টার মধ্যে তাকে ভবন ত্যাগের আলটিমেটাম দেন। কিন্তু তিনি ভবন না ছাড়ায় শিক্ষার্থীরা দুপুর ১২টার পর ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং ভেতরের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এতে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে যান উপাচার্য ও তার সঙ্গে থাকা সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা।

যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মাহতাব চৌধুরী বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগ ও ক্যাম্পাসের সর্বস্তরের দাবিকে চরমভাবে উপেক্ষা করে উপাচার্য শরীফুল আলম তার রাজনৈতিক ক্যাডার বাহিনী নিয়ে উপাচার্য ভবনের তালা ভেঙে প্রবেশ করেছেন। অবিলম্বে আমাদের এক দফা দাবি মেনে নিয়ে সায়েম স্যারকে উপাচার্য পদে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত উপাচার্য ভবন এভাবেই তালাবদ্ধ থাকবে।’

নতুন উপাচার্যকে প্রত্যাখ্যান শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের : বহিরাগতদের সহায়তায় উপাচার্য ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন দাবি করে তাকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছে চুয়েট শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। ওই তিন সংগঠনের যৌথ জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, নবনিযুক্ত উপাচার্য বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করায় উদ্ভূত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চুয়েট শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে তার ক্যাম্পাসে উপস্থিতি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছে। তৎপ্রেক্ষিতে ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি তৈরি হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার নবনিযুক্ত উপাচার্যকেই বহন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, পূর্বঘোষিত দাবি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত চুয়েটের সর্বস্তরের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সব প্রকার প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকবেন। এই সময়জুড়ে পূর্ণ কর্মবিরতি পালনের পাশাপাশি প্রশাসনকে সর্বাত্মক অসহযোগিতা করা হবে।

ছাত্রদের ওপর বহিরাগতদের হামলা : এদিকে দুপুর আড়াইটার দিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মদুনাঘাট এলাকায় চুয়েটগামী বাস অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মারধর ও হেনস্তারও অভিযোগ ওঠে। পরে বিকেল সোয়া ৪টার দিকে নগরীর বহদ্দারহাট এলাকায় শিক্ষার্থী বহনকারী বাসে দ্বিতীয় দফায় হামলার ঘটনা ঘটে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের যমুনা নামক বাসের চালক মো. ইব্রাহিম  বলেন, ‘বহদ্দারহাট থেকে আমরা ২টায় রওনা দিয়েছি। পথে কিছু সন্ত্রাসী মদুনাঘাটে বালুর ট্রাক দিয়ে আমাদের পথ রোধ করে। তারা আমাকেসহ কয়েকজন ছাত্রকে চুল ধরে টানে, মারধর করে। তারা গাড়ি ঘুরিয়ে শহরের দিকে আমাদের ফিরে যেতে বাধ্য করে। যেখানেই চুয়েটের গাড়ি দেখছে, তারা সেখানেই হামলায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে।’

এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে চুয়েটের শিক্ষক সমিতি। এর প্রতিবাদে বিকেল সাড়ে ৩টায় একটি মৌন মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তন থেকে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আসেন শিক্ষকরা।

উপাচার্যের বক্তব্য : নিজ কার্যালয়ে প্রবেশের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। তিনি বলেন, ‘ছাত্ররা যে আন্দোলন করছে, তাদের যেটা দাবি আমি শুনব। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যেভাবে নিতে হয়, যুক্তিসঙ্গতভাবেই নেওয়া হবে। গত সাত দিন ধরে হলের কিছু শিক্ষার্থী বিভিন্নভাবে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কবে ক্লাস শুরু হবে তা নিয়ে তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। আমি ক্লাস করাতেই চাই। অনেক শিক্ষক, তারা ক্লাসে ফিরতে আগ্রহী। এরকম একটা অবস্থায় চিন্তা করলাম আমার আর বাইরে থাকা ঠিক হবে না। ক্যাম্পাসে অবস্থান করা জরুরি বিধায় আমি ক্যাম্পাসে আজকে সকালে চলে আসি।’

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি যে, নিয়মিত ক্লাস কীভাবে শুরু করা যায়। বিভাগীয় প্রধান ও দপ্তর প্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করে খুব দ্রুতই আমরা শিডিউলটা জানিয়ে দেব। যে তিন সপ্তাহে ১৪-১৫ দিন ক্লাস হলো না, এটার জন্য একটা একাডেমিক রিকভারি প্ল্যান আমরা তৈরি করব। অনানুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকদের সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা করেছি। সবার সদিচ্ছা থাকলে ইতিবাচকভাবে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিব ইনশাল্লাহ।

সন্ধ্যায় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দিনভর বিদ্যুৎ, পানি ছাড়া খুব মানবেতর অবস্থায় আছি। আমার সঙ্গে কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী আছে। তারাও অবরুদ্ধ। শিক্ষক, কর্মচারীদের প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা তো আমাকে দেখেওনি, আমার কাজও দেখেনি। তাহলে কীসের ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করবে? তারা কারও প্রভাব বা উসকানিতে পা দিয়ে এরকম করেছে কি না, এটাও প্রশ্ন।

উল্লেখ্য, গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিক অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আর এর প্রতিবাদেই চুয়েটে আন্দোলন চলছে সেদিন থেকে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২৪ সেপ্টেম্বর অনলাইন যোগদান করেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। শিক্ষার্থীদের একটাই দাবি আগের উপাচার্যকে বহাল করতে হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত