অজ্ঞাত লাশ

জীবনের সুরক্ষা রাষ্ট্রের দায় 

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৩ এএম

মানুষের সামাজিক কিংবা পারিবারিক পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু সেই পরিচিতিটা কীভাবে অজ্ঞাত হয়ে যাচ্ছে তা ১৩ অক্টোবর উঠে এসেছে দেশ রূপান্তরের শীর্ষ প্রতিবেদনে। অজ্ঞাত লাশের আড়ালে ‘হত্যা’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের পর জানা যায় সেটি হত্যাকা-। এমন অনেক হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আবার কোনো লাশের কূলকিনারাই  হচ্ছে না। দিন দিন অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। পুলিশের তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে দুই হাজার অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে উদ্ধার হয় ৩৬২টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ। ২০২৪ সালে বেড়ে ৫১০ ও ২০২৫ সালে দাঁড়ায় ৬৪১টিতে। চলতি বছরের ৯ মাসেই উদ্ধার হয়েছে ৪৮৯টি। উল্লিখিত তথ্য একদিকে মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকট, অন্যদিকে রাষ্ট্রের দায়ের বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এসেছে। দেশ রূপান্তরের কাছে তদন্তসংশ্লিষ্টসহ পুলিশ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয়েছে তাতে প্রতীয়মান হয়, একেকটি জীবনের ‘নাই’ হয়ে যাওয়ার অন্তরালে কী ভয়াবহ অপরাধের নকশা রয়েছে।

আমরা দেখছি, প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের খবর আসে। পরিচয়হীন লাশ যেমন জনমনে বাড়াচ্ছে আতঙ্ক, তেমনি জাগছে এ প্রশ্নও কেন বাড়ছে অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা? নাম না জানা যে মানুষটি ‘নাই’ হয়ে যাচ্ছে, সেই মানুষটির পরিবার তার লাশের খবর কখনো পায়, কখনো পায় না। লাশ পেলে মামলা হয়। কিন্তু তা কতদূর এগোয় সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। অনেক ক্ষেত্রে নিখোঁজ হয়েই থেকে যেতে হয় মানুষটিকে। অজ্ঞাতনামা লাশের সারি কেন ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে এর ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় যাদের, তাদের জনগুরুত্বপূর্ণ এ প্রসঙ্গটি নিয়ে উদাসীন থাকার অবকাশ নেই। অজ্ঞাত লাশের বৃহদাংশই যে হত্যাকান্ডের শিকার এও প্রতীয়মান হয় দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে। সীমানা জটিলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি বহুবিধ দুর্বলতায় মানবাধিকারের এই চরম লঙ্ঘনে  রাষ্ট্রের ঔজ্জ্বল্য তো বাড়েই না, উপরন্তু দুর্বৃত্ত কিংবা ঘাতকদের স্পর্ধা বাড়ছে প্রতিকারহীনতায়। ফরেনসিক প্রমাণের দীর্ঘসূত্রতাসহ এক্ষেত্রে বিদ্যমান নানামাত্রিক জটিলতায় স্বজন হারানো পরিবারগুলোর আর্তনাদ প্রলম্বিত হয়।

দেশে অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধার এবং তা শনাক্ত না হওয়ার বিষয়টি গভীর সামাজিক ও মানবিক সংকট হিসাবে দেখা দিয়েছে। আমরা দেখছি, অজ্ঞাত লাশের অধিকাংশই পচনশীল অবস্থায় উদ্ধার হয়। তাতে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত দুরূহ হয়ে পড়ে। ফরেনসিক টেস্টের দুর্বলতার কারণে কোনো উৎস পাওয়া যায় না। আবার ডিএনএ সংরক্ষণ করা হলেও ক্রসম্যাচে স্বজন পাওয়া যায় না। দিন দিন অজ্ঞাত লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পুলিশও এ ব্যাপারে গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে এই অভিযোগ জনপরিসরে বাড়ছে। আছে আরও অনেক প্রতিবন্ধকতা। এই প্রেক্ষাপটে তা সভ্যতার কলঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজবিরোধী নানা চক্রের সামাজিক অসহিষ্ণুতা সমাজকে এক চরম অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একটি সভ্য ও মানবতাবাদী সমাজের জন্য এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

প্রাচীন রোমের খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, বাগ্মী, লেখক ও  দার্শনিক মার্কাস তুলিয়াস সিসেরো বলেছেন, ‘জনগণের নিরাপত্তাই হবে সর্বোচ্চ আইন’। সরকারের প্রথম ও সর্বোচ্চ দায়িত্ব হলো জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এটি কোনো আপ্তবাক্য নয়; বরং মানবিক সমাজে এটাই স্বীকৃত সত্য। অজ্ঞাত লাশের সংখ্যা কেন বাড়ছে কিংবা দায়িত্বশীলদের জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ব্যর্থতার কারণ কী, এই বিষয়গুলো চিহ্নিত হওয়া জরুরি। কারণ কিংবা উৎস চিহ্নিত না হলে প্রতিবিধানের পথ কণ্টকাকীর্ণই থাকবে। তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে গতিশীলতার পাশাপাশি দায়িত্বশীল সব পক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমভাবেই জরুরি। পৃথিবীর কোনো দেশই শতভাগ অপরাধমুক্ত নয়। কিন্তু অপরাধ ঘটলে রাষ্ট্র কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং সেই ব্যবস্থার জন্য জবাবদিহির পথ কতটা সুগম, তা মুখ্য বিষয়। নিরাপত্তা মানুষের মৌলিক দাবি। নিরাপত্তাহীনতা যেকোনো সমাজের গুরুতর উপসর্গ। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য ভয়ভীতিমুক্ত সমাজ গঠনে রাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দিতেই হবে। মানুষ কেন অজ্ঞাত লাশে পরিণত হচ্ছে এর  উৎসে নজর গভীর হোক।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত