দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে নির্মিত নিউ ইয়ালু নদী সেতু। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে চীন ২০১৪ সালেই সেতুটির নিজস্ব অংশের নির্মাণকাজ শেষ করেছিল। তবে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ায় উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অংশের নির্মাণকাজ শেষ করেনি। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষার জেরে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা কঠোর করার পক্ষে চীনের অবস্থানের পর দুই দেশের সম্পর্কে শীতলতা দেখা দেয়।
এদিকে, চলতি মাসের শুরুতে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে প্রথম সরাসরি সেতুও চালু হয়েছে।
চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আবারও গতি পাচ্ছে। গত বছর উত্তর কোরিয়ায় চীনের রপ্তানি বেড়ে ২৩০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আগের বছরের তুলনায় এই রপ্তানি বেড়েছে ২৫ শতাংশ। গত জুনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পিয়ংইয়ং সফর করেন। ২০১৯ সালের পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম উত্তর কোরিয়া সফর।
২০১৮ সাল থেকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা চালিয়ে আসছে বেইজিং। একই সময়ে পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কেও সাময়িক উন্নতির আভাস দেখা গিয়েছিল।
কোরীয় যুদ্ধের সময় চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে ওঠে। ১৯৬১ সালে দেশ দুটি ‘মৈত্রী, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহায়তা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। চীনের একমাত্র আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট হিসেবে এখনো বহাল রয়েছে এই চুক্তি। এতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার বিধান রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, দুই দেশের কোনো একটি সশস্ত্র হামলার শিকার হলে অন্য দেশ তাকে সহায়তা করবে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চীন ছিল উত্তর কোরিয়ার প্রধান কূটনৈতিক অংশীদার ও নিরাপত্তার অন্যতম ভরসা। তবে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির কারণে ২০১৭ সালে পিয়ংইয়ংয়ের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা জোরদারের পক্ষে বেইজিং অবস্থান নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা পিয়ংইয়ংয়ের কূটনৈতিক নির্ভরতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। এর ফলে চীনের ওপর উত্তর কোরিয়ার নির্ভরতা কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৪ সালে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া একটি ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি’ স্বাক্ষর করে, যাতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার বিধানও রয়েছে। এরপর থেকে দুই দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার হয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধে অংশ নিতে উত্তর কোরিয়া হাজার হাজার সেনা পাঠিয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহ দেখিয়েছেন। গত মাসে তাঁর এমন ইঙ্গিত সামনে আসে। ২০১৯ সালে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে ট্রাম্পের আলোচনা আকস্মিকভাবে শেষ হয়ে যাওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক আর উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখেনি। ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে আবারও কিমের সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠকের দিনক্ষণ নির্ধারণ করা হয়নি।
দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত থাকলেও চীনা নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা দেওয়া এখনো পুনরায় চালু করেনি উত্তর কোরিয়া। অতীতে দেশটির বিদেশি পর্যটকদের বড় অংশই ছিলেন চীনের নাগরিক।