রাশিয়ায় পাচার হওয়া ২০ বাংলাদেশি যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৭ এএম

রাশিয়ায় উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশিকে পাচার করে একটি চক্র। পরে তাদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশগ্রহণে বাধ্য করা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। এ ঘটনায় মানবপাচার চক্রটির মূলহোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।

গতকাল বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বাহিনীর মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবির ১০ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার অতিরিক্ত ডিআইজি মোহা. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, মঙ্গলবার গভীর রাতে ফরিদপুরের নগরকান্দার আটাইল এলাকায় অভিযান চালিয়ে আসামি মিজানুর রহমান ও ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. আবু তাহের লেন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা জানায়, ভুক্তভোগী রাজন হোসেনকে (২১) কনস্ট্রাকশন কাজের কথা বলে ৮ লাখ ২৫ হাজার টাকায় রাশিয়ায় পাঠায়। গত ৭ মে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর জোর করে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। টানা ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাকেসহ বাংলাদেশি ৩০ জনকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়।

ডিআইজি মোহা. আসাদুজ্জামান বলেন, ভুক্তভোগীরা রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের জোর করে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হতো। মূলত প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্তে যুদ্ধের ময়দানে শিকার হিসেবে পাঠানো হতো তাদের। এরপর তাদের ওপর প্রতিপক্ষ ড্রোন হামলা করলে হামলাকারীদের অবস্থান ও দূরত্ব শনাক্তের জন্যই তাদের শিকার হিসেবে পাঠানো হতো।

সেখানে ড্রোন হামলায় রাজনের কোমরের হাড় ভেঙে যায় এবং দুই পায়ের শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। চার দিন কষ্ট করে হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসা নেন রাজন। একপর্যায়ে আহত অবস্থায় তিনি পালিয়ে দূতাবাসের সহায়তায় গত ২৩ আগস্ট দেশে ফিরে আসেন। তিনি বলেন, এরপর ক্ষতিপূরণ দাবি করলে মিজানুর রহমান ভুক্তভোগীর পরিবারকে মারধরের চেষ্টা ও প্রাণনাশের হুমকি দেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর বাবা কালীগঞ্জ থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেন।

এসআরবি কর্মকর্তা বলেন, এই চক্রের হোতারা প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশিকে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়াতে পাচার করে। পরে তাদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাধ্য করা হয়। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন বাংলাদেশি ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে এবং দুজন কোনোরকমে পালিয়ে দেশে ফিরে আসেন। এ ছাড়া বাকি আটজনের মধ্যে দুজন আহত হয়ে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বাকি ছয়জন এখনো যুদ্ধের ময়দানে রয়েছেন।

এসআরবি জানায়, পাচার চক্রের মূলহোতা মিজান জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির চেয়ারম্যান। এই এজেন্সির মাধ্যমে ২১ জন ভুক্তভোগীকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। বাকিদের ওই দেশে পাঠানোর পেছনে মোস্তাফিজুর রহমান ও আলী নামের আরও দুজনের সম্পৃক্ততা পেয়েছি। পাশাপাশি পাচার চক্রে হারেস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ভুক্তভোগী ৩০ জনকেই পাসপোর্ট থেকে শুরু করে, প্লেনে উঠিয়ে দেওয়া পর্যন্ত সব কাজ করেছিল মূলহোতা মিজান। ভুক্তভোগীরা রাশিয়া গিয়ে যখন তাদের কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে জানতে পারে তখন ওই ৩০ জন মিজানকে অনুরোধ করেছিল যে, আমাদের ভুল জায়গায় আপনারা পাঠিয়েছেন, আমাদের রক্ষা করেন, ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। কিন্তু তারা ভুক্তভোগীদের কোনো কথা শোনেনি। বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় মানবপাচার চক্রের সঙ্গে রাশিয়ার দুই ব্যক্তির জড়িত থাকার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত