প্রথমেই জিজ্ঞাসা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কি নিজেরা নির্ভরতাহীনভাবে কাজ করতে পারে না? স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিরা তো জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত। কিন্তু তারা সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয়ভাবে উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদেরই মুখ্য ভূমিকা থাকবে এটি স্বাভাবিক। তারা যাতে স্বনির্ভর থেকে কাজ করতে পারে, এজন্য সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণসহ আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করাটা অত্যন্ত জরুরি। এ কাজটা অনেক আগে শুরু হলেও আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি, এটাই বাস্তবতা। নিজেদের আয়ের পরিধি বাড়িয়েও তা তারা করতে পারে। একই সঙ্গে তারা সরকারসহ অন্যান্য যে ক্ষেত্র থেকে অনুদান পায়, এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে বটে, কিন্তু নির্ভরতা কমাতে হবে। তাহলে তারা অনেকটাই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। স্থানীয় সরকার স্বনির্ভর হোক, নিজের পায়ে দাঁড়াক এটা আমাদের প্রত্যাশা। গণতন্ত্রের ধ্রুপদি অনুশাসন হচ্ছে স্থানীয় সরকার গণতন্ত্রের সূতিকাগার। স্থানীয় সরকারের গুণগত মানের সঙ্গে জাতীয় রাজনৈতিক চর্চা, রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশের ওপরই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নির্ভর করে।
শুরুতে বলেছি, কাজটা শুরু হয়েছিল বহু আগে, কিন্তু চূড়ান্ত রূপ পায়নি আজও। স্বাধীনতা অর্জনের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো সুসংহত করার কিছু পরিকল্পনা ছিল। ওই পরিকল্পনার মধ্যে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলার ভাবনাও ছিল। যদিও সুসংহত কাঠামো পূর্ণাঙ্গ রূপদানের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যাও এর সামনে ছিল। প্রথমে স্থানীয় সরকারকে ‘পঞ্চায়েত’ নামে অভিহিত করা হলো। পরে নাম হলো ‘ইউনিয়ন পরিষদ’। এদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাকারী জিয়াউর রহমান পল্লী জনগণকে তৃণমূল পর্যায়ে স্থানীয় সেবা প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা। এরশাদ সরকারের আমলে স্থানীয় সরকারকে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম পরিচালনা সহজ করতে উপজেলা পরিষদ গড়ে তোলা হয়। এভাবে সরকারের তাঁবেদারে পরিণত হয়, স্থানীয় সরকারের অংশীজনরা। সংবিধানের চতুর্থ ভাগের দ্বিতীয় পরিচ্ছদের ৫৯ (১) ধারায় বলা আছে, ‘আইন অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ সংবিধানে মূলত স্থানীয় শাসনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ কোনো নির্ধারিত স্থানে স্থানীয় সরকার জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অভিযোগ শুনতে হচ্ছে, প্রকৃতার্থে দেশে স্থানীয় শাসন নেই। কারণ স্থানীয় সরকার শাসনব্যবস্থায় দায়িত্বশীল কেউ স্থানীয়ভাবে কোনো তহবিল সংগ্রহ করেন না। তারা সরকারের দেওয়া বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল। সরকার স্থানীয় সরকারের জন্য যে বরাদ্দ দেয় তা মূলত ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ইউএনডিপি ও জাইকা, কিংবা অন্যান্য দাতা সংস্থা থেকে সংগ্রহ করে। স্থানীয় শাসন পরিচালনার পদ্ধতিগুলো তারা অনুসরণ করে না। বরাদ্দ সংগ্রহ এবং কেন্দ্রীয় নির্দেশ অনুসারে কাজ করাকে স্থানীয় শাসন বলা চলে না।
স্থানীয় সরকার কাঠামোর ইতিহাসের ধারাবাহিকতার সূত্র ধরে এগিয়ে এলে দেখা যায়, বিভিন্ন সময় স্থানীয় সরকার কাঠামো রাজনৈতিক স্বার্থে ভঙ্গুর করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার কাঠামোর জনপ্রতিনিধিদের সরকারের সঙ্গে আঁতাত করতে হয়েছে। এ সরকারব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনের সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন গুলিয়ে ফেলার যে পরিস্থিতি কখনো কখনো দৃশ্যমান হয়েছে তা অনাকাক্ষিত। এ দুটি নির্বাচনের আমেজ ও পরিবেশ আলাদা। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোটের দিন প্রার্থী তার সমর্থকগোষ্ঠী নিয়ে আসেন। যেহেতু সবাই পরিচিত তাই ভোটারদেরও প্রার্থী সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকে। ফলে এ ধরনের নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক কোনো প্রার্থীকে পরাজিত করে স্বতন্ত্র বা বিরোধীদলীয় সমর্থক কোনো প্রার্থী বিজয়ী হন। কিন্তু সেই বিরোধীদলীয় বা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সরকারের সঙ্গে আঁতাত করতেই হবে এটাই যেন নিয়তি হয়ে পড়ে। স্থানীয় সরকার সরকারের দেওয়া বরাদ্দের ওপর নির্ভর করে। সেই বরাদ্দ না পেলে উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন। ইউএনডিপি ও জাইকার মতো সংস্থা স্থানীয় সরকারের উন্নয়নে, কাঠামোগত সংস্কারে অনেকবার বরাদ্দও দিয়েছে। কিন্তু কার্যত এ ক্ষেত্রে কাজের কাজ কিছু হয়নি বরং স্থানীয় সরকার এখনো স্থানীয় প্রশাসনের অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়ে গেছে। ফলে স্থানীয় সরকারকাঠামোয় নির্বাচিত হলেও ওই জনপ্রতিনিধিরা সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে কার্যক্রম পরিচালনা করতে করে আসছেন।
সরকার যেকোনো কারণ দেখিয়ে যেকোনো সময় স্থানীয় সরকার প্রতিনিধির পদ বাতিল ঘোষণা করতে পারে, এমনটি স্থানীয় সরকার আইনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। ফলে আমরা বলছি, স্থানীয় সরকার কাঠামোর কথা কার্যত রয়ে গেছে স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানের মোড়কে। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ অবস্থানে কাজ করছে। সেজন্য তাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে। কার্যত স্থানীয় সরকারের যে দর্শন, তা পুরোপুরি উপেক্ষিত। একসময় কাঠামো কিছুটা হলেও ছিল, কিন্তু এখন তা-ও নেই এমন অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ ক্ষীণ। কখনো মনে হয়, স্থানীয় সরকার যেন অনেকাংশে প্রশাসনের বর্ধিত কোনো স্তর। স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার নিয়ন্ত্রিত-নির্দেশিত প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত নয়। কারণ নিজেদের শক্তি খুব কম, বিশেষভাবে অর্থনৈতিক শক্তি। স্বশাসনের এ দর্শন ভুলে যাওয়ার ফল ভালো হয়নি। আগামীতে স্থানীয় সরকার কাঠামোর বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নেœর বিষয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। কিন্তু স্থানীয় সরকার কাঠামোয় কাক্সিক্ষত বিষয়গুলোর অনুপস্থিতির ফলে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি উপেক্ষা বাড়ছে, যা মোটেও জন্য শুভ নয়। সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা সরাসরি স্থানীয় সরকার ইত্যাদি পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের থেকে বরাদ্দ সংগ্রহ করে। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে অংশীজনরা সরকারের বর্ধিত অংশের মতো কাজ করলে তাতে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ার পথটিই সুগম হয়।
স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ইংল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ও নর্ডিক অঞ্চলের দেশগুলোয় বেশি কার্যকর। এ দেশগুলোর স্থানীয় সরকারের স্বরূপ আমাদের পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। আমরা যদি এশিয়ার দেশ জাপানের দিকে তাকাই, তাহলে স্থানীয় সরকার কাঠামোর প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখতে পাব। জাপানে প্রিফেকচার নামে বিভিন্ন অঞ্চল ভাগ করা হয়েছে। প্রিফেকচারের প্রিফেক্ট স্থানীয়দের ভোটে নির্বাচিত হন। জেলা প্রশাসনের প্রধান প্রিফেক্টের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সব নাগরিক সেবা এ প্রিফেকচারই প্রদান করে থাকে। নাগরিকের তথ্য ও সেবার মান নিশ্চিত করার সুষ্ঠু ব্যবস্থা স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জাপানে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালীন জাপানের স্থানীয় সরকার কাঠামো সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তিনি জেলা গভর্নরশিপ চালু করতে চেয়েছিলেন। যদি সম্ভব হতো, তাহলে দেশে স্থানীয় সরকার কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা দুরূহ হতো না। তার পরিকল্পনা ছিল, নির্বাচনের ভিত্তিতে কেউ জেলা গভর্নর হবেন। জেলা গভর্নরের অধীনে ডিসি ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা যেন দ্বৈতসত্তাগত সংকটে আছে। এখানে জেলা পরিষদ আছে, আছে ইউনিয়ন পরিষদ। উপজেলা পরিষদে নির্বাচিত চেয়ারম্যানের ক্ষমতা যেন কাগজে-কলমে। তা ছাড়া স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় যারা নির্বাচিত হন তাদের অনেকে আইনের সঙ্গে পরিচিত নন। স্থানীয় শাসন কার্যক্রম পরিচালনায় তাদের দক্ষতাও কম। স্থানীয় সরকারের অংশীজনদের যথাযথ প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় না।
আবার বলি, স্থানীয় সরকারের কাঠামো আছে দর্শন নেই। এর পুনরুদ্ধার জরুরি। এর নিরসন ঘটতে পারে যদি জনকল্যাণের চিন্তাটা প্রাধান্য পায়। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকারের বিষয়গুলো সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকার এ নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এ প্রত্যাশা রাখি। মনে রাখতে হবে, স্থানীয় সরকার শুধু প্রতিষ্ঠাননির্ভর হলে আমাদের জন্য ইতিবাচক কিছু বয়ে আনবে না। এ বিষয়ে সরকারকে তো বটেই, রাজনৈতিক দলগুলোকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। সময় এসেছে, নতুন কাঠামো পুনর্র্নির্মাণের। ব্যাপকভাবে নির্বাচনব্যবস্থায় সংস্কার আনা জরুরি। নির্বাচন কমিশনকেও কাক্সিক্ষত ভূমিকা পালনের পথ সুগম করা বাঞ্ছনীয়। যদি তা সম্ভব হয়, তাহলে স্থানীয় সরকারকে পরিপূর্ণ রূপ দেওয়ার পথ তৈরি হবে। ধারণা করা হচ্ছে, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হবে আগামী বছরের মার্চে। তবে এর আগে স্থানীয় সরকার কাঠামো গড়ে তোলার পথে যে সংকট রয়েছে, তা নিরসনে সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া সার্বিক স্বার্থে জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে উন্নয়ন ও কল্যাণমুখী কার্যক্রম নিশ্চিত করা আরও সহজ হবে। বিশেষত বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট প্রশমনেরও সুযোগ তৈরি হবে, যা এ মুহূর্তে আমাদের অন্যতম উদ্বেগের কারণ।
লেখক : শিক্ষাবিদ, জনপ্রশাসন ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ।