ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে?  

আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০৮ এএম

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম কিছুদিন আগে বলেছেন, ভূগর্ভস্থ পানি যত কম ব্যবহার করা যাবে, পরিবেশের জন্য তত ভালো হবে। তিনি সেখানে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে পুকুর, জলাশয় ও বৃষ্টির পানি ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। ১৯৯০ সালে একটি সংবাদপত্রে শিরোনাম ছিল ‘পরবর্তী বিশ্বযুদ্ধ হবে পানির জন্য।’ বিশ শতকে পানিকে কেন্দ্র করে বিশ্বযুদ্ধ হতে পারে, এমন সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও আবহাওয়া পরিবর্তন ভিন্ন সংকেত দিচ্ছে। বলা হচ্ছে, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে ২০ থেকে ৪০ ভাগ মানুষ পানি ও খাদ্যসংকটে ভুগবে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের জলাভূমি গত ৫০ বছরে ৭০ ভাগ কমেছে। ১৯৭১ সালে জলাভূমির পরিমাণ ছিল ৯৩ লাখ হেক্টর। তা কমে হয়েছে ২৮ লাখ হেক্টর। বিশে^র দিকে তাকালেও এ চিত্র চোখে পড়বে। বিশ্বের মোট জলাভূমির প্রায় ৯০ শতাংশ বিলুপ্ত হয়েছে। বাকি জলাশয় হুমকির মুখে। এসব জলাভূমি মোট প্রাণী প্রজাতির ৪০ ভাগের আশ্রয় স্থল। প্রতিনিয়ত এসব জায়গা থেকে নতুন নতুন প্রজাতি আবিষ্কৃত হচ্ছে। প্রায় ৬৪ প্রজাতির উভচর তো বটেই ৮৩ প্রজাতির সৈকত পাখি, ৩০ প্রজাতির বুনোহাঁস, ৮ প্রজাতির শামুকখোলসহ অসংখ্য প্রজাতি এর ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। প্রতি বছর শীতের সময় বিপুল সংখ্যক পরিযায়ী পাখি দেশে আসে যাদের আবাসস্থল ও খাবার দুটোই জলাভূমিকে কেন্দ্র করে। বিভিন্ন কারণে জলাশয় হারিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও সঠিক পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কথা বলছে। এসবের মধ্যে তিস্তা পানি বণ্টন অন্যতম। বেসরকারি সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের তথ্যমতে, ১৯৮০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ঢাকায় ৬০ শতাংশ জলাধার বিলুপ্ত হয়েছে।  ২০২২ সালে আরডিআরসির দেওয়া তথ্যমতে, বুড়িগঙ্গা নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ গড়ে লিটারপ্রতি ২ মিলিগ্রামের নিচে। এর অর্থ হচ্ছে, পানিতে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণী বাঁচার জন্য দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ থাকতে হয় লিটারপ্রতি ৪ মিলিগ্রাম। বুড়িগঙ্গা নদীর জলজ প্রাণীর অবস্থা বুঝতে ভিন্ন তথ্যের প্রয়োজন নেই। তারা মোট ৫৬টি নদী নিয়ে গবেষণা করেছিল। ৫৬টি নদীর মধ্যে ঢাকা বিভাগের ১৯টি নদীর অবস্থা ভয়াবহ দেখা গেছে। ঢাকা বিভাগের ১৯টি নদী মারাত্মক দূষণের সম্মুখীন।

মৎস্য বিভাগের ঢাকার পুকুর নিয়ে জরিপ অনুযায়ী ঢাকায় ১২০টি সরকারি পুকুর, ৩২টি বেসরকারি পুকুর এবং ৩১টি লেক আছে। অথচ ১৯৮৫ সালে পুকুরের সংখ্যা ছিল ২ হাজার। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, পুরান ঢাকায় ১৯২৪ সালে ১২০টি পুকুর ছিল। এখন আছে ২৪টি অর্থাৎ ৯৬টি পুকুর ভরাট করা হয়েছে। ঢাকায় ২৪১টি পুকুর কোনোরকমে টিকে আছে। পুরান ঢাকায় টিকে আছে ২৪টি। তাদের মতে, একটি শহর ৫ শতাংশ জলাশয় থাকার প্রয়োজন থাকলেও আছে মাত্র ২.৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স জলাধারগুলো নিয়ে একটি গবেষণা করেছিল। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ঢাকা শহরে সবুজ এলাকা ও ফাঁকা জায়গা ছিল ৫৩.১১ বর্গকিলোমিটার। ২০২৩ সালে তা কমে হয়েছে ২৯.৮৫ বর্গকিলোমিটার। ১৯৯৫ সালে ঢাকায় জলাভূমি ও জলাধার ছিল ৩০.২৪ বর্গকিলোমিটার। জলাভূমি ভরাট হয়ে এখন তা হয়েছে ৪.২৮ বর্গকিলোমিটার। শুধু কমে যাওয়া নয় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে দিন দিন। ২০১৯ সালে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ৩ হাজার ১৬২ একর জলাশয়ের মধ্যে ভরাট হয়েছে ২৭ শতাংশ। যার ফলে তাপমাত্রা বেড়ে চলেছে। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় ১৯৮৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১ হাজার হেক্টরের বেশি জলাভূমি হারিয়ে গেছে। তাদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে জলাভূমির পরিমাণ ১০ ভাগের নিচে নেমে আসবে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে খালের সংখ্যা ৪৭টি। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের হিসাব মতে, ঢাকায় ৫৬টি খাল থাকার কথা থাকলেও সব প্রায় মৃত। যদিও ২৬টি খাল উদ্ধারের পরিকল্পনা নিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শহরে কমপক্ষে ১৫% জলাধার থাকা দরকার। কিন্তু বাস্তবে এখন তা ৪-৫% এরও কম। এই অবস্থা চলতে থাকলে, জলাধার হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ওপর নির্ভরশীল অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী মারা যাবে। নানা রকম জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী হারিয়ে যাবে। নষ্ট হবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। হুমকির মুখে পড়বে জীববৈচিত্র্য। জলাধার না থাকার কারণে, বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে সেখানে মশার বংশবৃদ্ধি ঘটাবে। বাড়বে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন রোগ।

প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ অনুযায়ী, প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার পরিবর্তন, ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তর বেআইনি। এ আইন ভঙ্গ করলে, ৫ বছরের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এই অবস্থায় সুপেয় পানির চাহিদা বাড়ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী, পানি সরবরাহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। এজন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাকেও এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে পুকুর বা অন্যান্য জলাশয় যত্রতত্র যাতে ভরাট না হয়, সেজন্য আইনের প্রয়োগ ও নজরদারি প্রয়োজন।

লেখক : পরিবেশবিষয়ক লেখক।

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত