মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বিশ্ববাজারে কমেছে অপরিশোধিত তেলের দাম। সরবরাহ সংকটের ঝুঁকির পাশাপাশি জাহাজে পরিবাহিত তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে পরিবহন ব্যয় কমানোর যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ বিবেচনায় নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। খবর রয়টার্সের।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ দশমিক ৪২ ডলারে নেমে আসে। গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৩টা ৩৭ মিনিটে ব্রেন্টের দাম ১ ডলার ৬৪ সেন্ট কমে যায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ৯৮ সেন্ট বা ১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ১১ ডলারে দাঁড়ায়। আগের সেশনে দাম বাড়লেও বৃহস্পতিবার তা কমে যায়।
এর আগের দিন হুতিদের সৌদি আরামকোর সদর দপ্তরে হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ লক্ষ্য করে নতুন কৌশলে হামলা চালানোর বিষয়ে ইরানের ঘোষণার পর ডব্লিউটিআইয়ের দাম তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। ইরান জানিয়েছিল, তেলের দাম উঁচু রাখতে তারা জাহাজে হামলা জোরদার করবে।
বুধবার সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালির কাছে পৃথক দুটি ঘটনায় প্রজেক্টাইলের আঘাতে একটি কনটেইনারবাহী জাহাজ ও একটি শুকনো পণ্যবাহী জাহাজ ডুবে গেছে।
গত ১০ দিনে এই নৌপথের আশপাশে হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ইরানের দাবি, দেশটির বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং গত মাসে আরোপ করা কঠোর নিষেধাজ্ঞার জবাবে তারা হামলা বাড়াচ্ছে।
তেল পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের চিন্তা যুক্তরাষ্ট্রের
ইরান যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় পরিবহন ব্যয় রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাশিয়া, ইরান ও ভেনেজুয়েলাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পরিবহনকারী তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিটের’ জাহাজগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টি বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
বুধবার এক মার্কিন কর্মকর্তা এ তথ্য জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার মূল বিষয় হলো, আগে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কিছু জাহাজকে ‘বৈধ তেল’ পরিবহনের অনুমতি দেওয়া যায় কি না।
এদিকে রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে তেলের উৎপাদন বাড়ায় বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) বুধবার জানায়, সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের উৎপাদন দৈনিক ৬৫ হাজার ব্যারেল বেড়ে ৮৪ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উৎপাদন দৈনিক ৮ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল কম রয়েছে।
আইইএর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি দৈনিক ৪৪ লাখ ব্যারেল বেড়ে যুদ্ধ শুরুর আগের মাত্রার প্রায় ৭৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ফিলিপ নোভার বাজার বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান প্রিয়াঙ্কা সচদেবা এক গ্রাহক-নোটে বলেন, নিকট ভবিষ্যতে যুদ্ধ বন্ধের কোনো চুক্তি হওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকলেও বিকল্প রুট ও পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে তেল ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে।
তাঁর মতে, বিকল্প ব্যবস্থাগুলো তেল সরবরাহে বড় ধরনের সংকট এড়াতে সহায়তা করেছে। তবে এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং নতুন করে কোনো বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক সরবরাহ আবারও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও তেলের মজুতের পরিসংখ্যান বিনিয়োগকারীদের নজরে রয়েছে। আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের (এপিআই) তথ্যের বরাত দিয়ে বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বুধবার জানায়, গত সপ্তাহে দেশটিতে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির কিছু মজুত কমেছে। তবে গ্যাসোলিনের মজুত বেড়েছে।
সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ৯ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত ১ কোটি ১১ লাখ ব্যারেল কমেছে। রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকেরা যে পরিমাণ মজুত কমার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, প্রকৃত হ্রাস তার চেয়ে অনেক বেশি।
তবে মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও তেলের দাম খুব একটা বাড়েনি। বৃহস্পতিবার এক নোটে হাইটং ফিউচার্স জানায়, ইতিবাচক বাজারসংবাদের পরও দাম না বাড়ার বিষয়টি ইঙ্গিত করে যে বর্তমান পর্যায়ে আরও মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ছুটতে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) আনুষ্ঠানিক মজুতের পরিসংখ্যান বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায়, অর্থাৎ গ্রিনিচ মান সময় বিকেল ৪টায় প্রকাশের কথা রয়েছে। কলম্বাস ডে উপলক্ষে সোমবারের ছুটির কারণে তথ্য প্রকাশ এক দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।