দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে পাওয়ার পর ডা. এম আর খান শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ পরিচালনাকারী শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশের বর্তমান কার্যকরী পরিষদ সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালনা এবং নতুন কার্যকরী পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের অফিস আদেশে অবসরপ্রাপ্ত সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. খায়রুল ইসলামকে তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলীর আহ্বায়ক করা হয়েছে। আদেশ অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে মণ্ডলীর অন্য সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হবে। আগামী ৯০ দিনের মধ্যে বিধি অনুযায়ী কার্যকরী পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করে নির্বাচিত পরিষদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ শাখার জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশনের বর্তমান কার্যকরী পরিষদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি যশোর শিশু হাসপাতালের স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল ও অর্থ স্থানান্তর নিয়ে পৃথক অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব অভিযোগ তদন্তে গত ২৯ জুলাই দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ৩০ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদন পর্যালোচনায় বর্তমান কার্যকরী পরিষদের অনিয়ম পরিলক্ষিত হওয়ায় স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৯(১) ধারা অনুযায়ী পরিষদটিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।
এই প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি অভিযোগপত্রে ফাউন্ডেশনের মহাসচিব রেজা করিম ও কার্যকরী পরিষদের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগে বিধি লঙ্ঘন, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবহারে অনিয়ম এবং কমিটি পরিচালনায় একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীরা এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, কার্যকরী পরিষদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। নিয়োগপ্রক্রিয়া, প্রতিষ্ঠানের ফার্মেসি পরিচালনা, বিভিন্ন খাতে ব্যয় এবং আর্থিক হিসাব সংরক্ষণ নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ফাউন্ডেশনের কয়েকটি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও নির্ধারিত যোগ্যতার নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ, পদায়ন ও চাকরিসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে। এসব অভিযোগ যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নিয়োগপত্র, অনুমোদিত জনবল কাঠামো, কার্যবিবরণী ও আর্থিক নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে অভিযোগপত্রে উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি।
ফাউন্ডেশনের ফার্মেসি পরিচালনা, সংশ্লিষ্ট আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং ভাড়া ও ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি এবং কিছু সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা সুবিধা পেয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া অনুদান, আর্থিক সহায়তা এবং প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাব নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।
জনকল্যাণমূলক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অর্থের উৎস, ব্যয়ের খাত এবং তার বিপরীতে প্রদত্ত সেবার হিসাব যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে অভিযোগপত্রে উল্লেখিত অর্থের পরিমাণ ও অনিয়মের দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই না করে সেগুলোকে প্রমাণিত আর্থিক আত্মসাৎ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত নির্দিষ্ট হাসপাতাল ও সংস্থার মাধ্যমে দরিদ্র রোগীদের ৩০ শতাংশকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কার্যক্রম রয়েছে। ওই তালিকায় ডা. এম আর খান শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ, মিরপুর, ঢাকার নামও রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ কার্যক্রমের আওতায় হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দরিদ্র রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার শর্ত যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে না। এ অভিযোগ যাচাই করতে রোগী নিবন্ধন, ছাড়পত্র, বিল, বিনা মূল্যে চিকিৎসা পাওয়া রোগীদের তালিকা এবং সরকারি অনুদান বা চুক্তির শর্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এসব নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে দরিদ্র রোগীদের জন্য নির্ধারিত সুবিধা বাস্তবে কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে, তা নির্ণয় করা সম্ভব হবে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের আদেশে তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়া কার্যকরী পরিষদের কাছ থেকে দ্রুত দায়িত্ব বুঝে নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী সমাজকল্যাণ সংস্থাসমূহ (রেজিস্ট্রেশন ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ, ১৯৬১, সংশ্লিষ্ট বিধিমালা এবং প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদেশ অনুযায়ী, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে বিধি অনুসারে কার্যকরী পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। নির্বাচনসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচিত পরিষদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে গৃহীত কার্যক্রমের প্রতিবেদন সমাজসেবা অধিদপ্তরে জমা দেবে।
এ সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনায় সাময়িক পরিবর্তন আসছে। তবে অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি, আর্থিক হিসাব যাচাই এবং ভবিষ্যতে পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা আসভফুদ্দোলার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘তদন্ত করে যা পাওয়া গেছে, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
তবে তদন্তে কোন কোন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে, আর্থিক অনিয়মের নির্দিষ্ট পরিমাণ কত এবং দায় নির্ধারণে আরও কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশনের মহাসচিব রেজা করিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে জানা যায়, তিনি কানাডার নাগরিক এবং কানাডায় ফিরে গেছেন।
এখন দেখার বিষয়, তত্ত্বাবধায়ক মণ্ডলীর অধীনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন হয় কি না এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, নিয়োগপ্রক্রিয়া ও দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসাসেবায় কতটা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।