শারদীয় দুর্গা পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো। আজ মহাষষ্ঠী। আজ দেবীর জাগরণ (বোধন), আমন্ত্রণ ও অধিবাস সম্পন্ন হবে। সন্ধ্যায় বেলগাছতলে (বিল্ববৃক্ষ) আবাহন, সংকল্প ও ‘ত্রিনয়নী’ দুর্গা দেবীর নিদ্রা (বোধন) ভাঙিয়ে পূজার্চনায় তাকে বরণ করা হবে। গত ১০ অক্টোবর শুভ মহালয়ার মাধ্যমে সনাতন সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের পূণ্য লগ্ন বা ‘দেবীপক্ষ’র শুরু হয়। ওই দিন দেবী দুর্গা মর্ত্যলোকে পা রাখেন। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও পঞ্জিকামতে, এবার দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যে আগমন করেছেন। অন্যদিকে, পূজা শেষে দেবী নৌকায় চড়ে স্বর্গলোকে গমন করবেন।
সনাতন শাস্ত্র অনুযায়ী, মহালয়ার পরে শুরু হয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। বিশুদ্ধ পঞ্জিকা অনুযায়ী, আজ ষষ্ঠী পূজা শেষে মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। আজ থেকে ম-পগুলো ঢাকের বোল, চন্ডি ও মন্ত্রপাঠ, কাঁসর ঘণ্টা, শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠবে। এবার সুর্যোদয়ের সঙ্গে তিথির সম্পর্কের কারণে মহাসপ্তমী পূজা হবে দুই দিনে। আগামীকাল ২৯ আশি^ন (১৭ অক্টোবর) শনিবার ও ৩০ আশি^ন (১৮ অক্টোবর) রবিবার এ দুই দিন মহাসপ্তমী। মহাসপ্তমীতে ‘নবপত্রিকা’র আনুষ্ঠানিকতা পালন হয়। দেবীর বিভিন্ন রূপের প্রতীক হিসেবে নয়টি উদ্ভিদকে স্নান করিয়ে পূজা করা হয়। মহাসপ্তমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১ কার্ত্তিক (১৯ অক্টোবর) সোমবার মহাষ্টমী ও কুমারী পূজা, ২ কার্তিক (২০ অক্টোবর) মঙ্গলবার মহানবমী পূজা অনুষ্ঠিত হবে। ৩ কার্ত্তিক (২১ অক্টোবর) বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গা পূজার ছয়দিনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।
ষষ্ঠী পূজার কার্যক্রমের বিষয়ে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পুরোহিত প্রণব চক্রবর্তী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিদ্রাভঙ্গের (বোধন) জন্য দেবীকে জাগরণের প্রয়োজন হয়। এজন্য সাধারণত যেখানে পূজা হয় সেখানে বিল্লবৃক্ষ মানে বেলগাছতলে দেবীর জাগরণ হবে। আজ দেবীকে পূজা গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো ও অধিবাস হবে। অধিবাস হলো এই ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করার আগে যে সূচিতা বা পবিত্রতা পালন করা হয় তার বিভিন্ন মন্ত্র উচ্চারণ করা।’
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য মতে, এবার সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি স্থায়ী ও অস্থায়ী পূজাম-পে দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হবে। গতবারের চেয়ে এবার প্রায় দেড় হাজার বেশি পূজাম-প বেড়েছে। দুর্গাপূজাকে ঘিরে ইতিমধ্যে আয়োজকদের প্রস্তুতি শেষ। দুর্গাপূজা উপলক্ষে নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভালে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের প্রতিটি পূজাম-পে পুলিশ, আনসার, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সদস্য মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি ম-পে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। এবারের দুর্গা পূজায় সরকার নির্বাহী আদেশে দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে এই বর্ধিত ছুটি যুক্ত হয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়া যাবে।
পূজামণ্ডপের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা : শারদীয় দুর্গাপূজা নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনে আয়োজক ও দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ৩৩ হাজার পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি, কোস্টগার্ড, এসআরবি ও আনসার সদস্যের পাশাপিাশি সাদা টপাশাকে পুলিশ সতর্কাবস্থানে থাকবে সার্বক্ষণিক।
পুলিশের পক্ষ থেকে শারদীয় দুর্গাপূজা নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনে আয়োজক ও দর্শনার্থীদের জন্য পাঁচটি বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গুজব থেকে সতর্ক থাকা, পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা, বিসর্জনে নির্ধারিত রুট অনুসরণ এবং জরুরি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নম্বরে যোগাযোগ করা। আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সারা দেশে আড়াই হাজার সদস্য মোতায়েন করেছে এসআরবি ফোর্সেস। পূজা ঘিরে কোনো নাশকতার আশঙ্কা বা হুমকি নেই বলে জানিয়েছেন বাহিনীটির মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দিরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে এসআরবি নেওয়া নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দুর্গাপূজা ঘিরে কোনো নাশকতা বা হুমকি নেই। তবে পূজার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সারা দেশে আড়াই হাজার এসআরবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
একই দিন বৃহস্পতিবার রাজধানীর রমনা কালীমন্দির পরিদর্শন করেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। তিনি বলেন, দেশের সীমান্ত এলাকার আট কিলোমিটারের মধ্যে সব পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দুর্গাপূজার সময়ে দায়িত্ব পালন করছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় ১৮০০ পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা থাকবে।