বনের পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ, জরিমানা পিডি-ঠিকাদারকে

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৪ পিএম

'পাহাড় কাটা থামছেই না' শিরোনামে দৈনিক দেশ রূপান্তরে সংবাদ প্রকাশের পর কক্সবাজারের চকরিয়ায় সংরক্ষিত বনের পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণের ঘটনায় এলজিইডির প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১৫ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিবেশ ও প্রতিবেশগত ক্ষতিপূরণ হিসেবে এ অর্থ নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের লিখিত এ আদেশে নির্ধারিত অর্থ সাত কর্মদিবসের মধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়েরসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ১৪ অক্টোবর পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক আদেশে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিদর্শন প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা এবং শুনানি শেষে এ ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে।

আদেশে বলা হয়েছে, চকরিয়ার হারবাং এলাকায় সংরক্ষিত বনের দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় হারবাং ফরেস্ট অফিস থেকে কোরবানিয়াঘোনা পর্যন্ত নির্মাণাধীন সড়ক সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। পরিদর্শন প্রতিবেদন ও নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, পাহাড় কেটে প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এ কারণে পরিবেশের ক্ষতিসাধনের জন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।  

পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, শুনানি শেষে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর ধারা ৯-এর আলোকে পাহাড় কাটার কারণে Environmental Damage Assessment করা হয়। এতে পরিবেশের ক্ষতির পরিমাণ ১৫ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

জরিমানার আওতায় রয়েছেন সাউদার্ন চট্টগ্রাম রিজিওনাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক এবং কিশোরগঞ্জের ভৈরব এলাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোমিনুল হক।

এদিকে সংবাদ প্রকাশের পর সংরক্ষিত বনের পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণের ঘটনায় বন বিভাগের পক্ষ থেকেও পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হারবাং বনবিট কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম। তিনি জানান, দ্য ফরেস্ট অ্যাক্ট, ১৯২৭ (২০০০ সালের সংশোধিত)-এর ২৬(১)(খ) ও ২৬(১ক)(ঙ) ধারা, বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন, ২০২৬-এর ৭(১) ধারা এবং বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন, ২০১০-এর ৪ ধারার আওতায় মামলাটি করা হয়েছে। মামলার নম্বর ০৪/হার, চুন অব ২০২৬-২৭।

হারবাং বনবিট কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতর পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণের ঘটনায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে আইন অনুযায়ী পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এর আগে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বন বিভাগের আপত্তি ও কাজ বন্ধের নির্দেশের পরও চকরিয়ার হারবাং সংরক্ষিত বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের জন্য পাহাড় কাটা হচ্ছে। প্রতিবেদনের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের উত্তর হারবাং ফরেস্ট অফিসের পাশ থেকে পূর্ব দিকে একটি সরু পথ চলে গেছে। কিছু অংশে ইট বিছানো হলেও বেশির ভাগ অংশ কাঁচা। পথটির দুই পাশে গর্জনগাছ। কোথাও ধানখেত, কোথাও আবার পথের গা ঘেঁষে রয়েছে পাহাড়। পথটির শুরুতেই উত্তর পাশের একটি টিলা কেটে সড়কের সঙ্গে সমান করা হয়েছে। প্রায় আধা কিলোমিটার এগিয়ে উত্তর করমুহুরীপাড়ায়ও দেখা গেছে কাটা পাহাড়।

সাবানঘাটা সেতুর পর প্রায় ৬০০ ফুট এলাকায় পাহাড় কেটে পথটি চওড়া করা হয়েছে। কোথাও ৫ ফুট, কোথাও ৯ ফুট উঁচু পাহাড় কাটা হয়েছে। কাটা অংশের প্রস্থ ১০ থেকে ১২ ফুট। এতে কয়েকটি গাছও কাটা পড়েছে।

শতবর্ষী হারবাং সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া সরু পথটি এখন প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ পাকা সড়কে রূপ নিচ্ছে। ২৫ কোটি ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটি নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রকল্পে অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। 

তবে সংরক্ষিত বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের বিষয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছে বন বিভাগ। তাদের আশঙ্কা, পাকা সড়ক হলে বনের ভেতর জবরদখল বাড়বে। পাশাপাশি বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি হাতির চলাচলেও বাধা তৈরি হবে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, পাকা সড়ক হলে বনের ভেতর জবরদখল বাড়বে। বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ঝুঁকিতে পড়বে এবং হাতির চলাচলেও বাধা তৈরি হবে। তিনি বলেন, বিষয়টি বন বিভাগের নজরে আসার পর এলজিইডিকে চিঠি দিয়ে সংরক্ষিত বনের ভেতর কাজ বন্ধ করতে বলা হয়েছিল।

এদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তরের আদেশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়েরসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত