বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির হল বরাদ্দ ও কারিগরি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ জানিয়ে আসছেন নাট্যকর্মীরা। লাইট, সাউন্ড ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ত্রুটি, রিহার্সেল রুমের সংকট, অচল লিফট এবং অপরিচ্ছন্ন টয়লেটের মতো সমস্যার পাশাপাশি হল বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। নাট্যকর্মীদের অভিযোগ, এসব সমস্যা সমাধানে বারবার দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, হল বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেয় নির্ধারিত কমিটি।
নাটক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় নাট্যশালার মূল উদ্দেশ্য নাট্যচর্চা ও নাটক মঞ্চায়নকে উৎসাহিত করা। কিন্তু নাটকের বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য হল বরাদ্দ দেওয়ায় নাটকের দলগুলো অনেক সময় মঞ্চ পাচ্ছে না। এতে নিয়মিত নাট্যচর্চা ব্যাহত হচ্ছে। তাদের মতে, হল বরাদ্দে স্বচ্ছ নীতিমালা অনুসরণ, নাটকের দলগুলোকে অগ্রাধিকার এবং কারিগরি সমস্যার দ্রুত সমাধান জরুরি।
নাট্যকর্মীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, জাতীয় নাট্যশালার তিনটি হলের বিভিন্ন সমস্যা গত পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরেই। কিন্তু সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান হয়নি। এ পরিস্থিতিতে হল বরাদ্দের নীতিমালা কার্যকর করা এবং নাট্যকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিল্পকলা একাডেমির হল বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তবে শুধু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হল বরাদ্দ দিলেই হবে না, দর্শকের জন্য ভালো নাটক মঞ্চায়নের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, নতুন যেসব নাট্যদল ভালো কাজ করছে, তাদের সম্পর্কেও বরাদ্দদাতাদের খোঁজখবর রাখা দরকার। পাশাপাশি হলগুলোর কারিগরি উন্নয়নের বিষয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। কিছু সংস্কার হলেও লাইট ও সাউন্ডের সমস্যা রয়ে গেছে। তার মতে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে এসব অবকাঠামোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ অনেক আগেই নিশ্চিত করা উচিত ছিল।
নাট্যব্যক্তিত্ব লাকী ইনামের মতে, জাতীয় নাট্যশালার নাম থেকেই বোঝা যায়, এটি নাটক মঞ্চায়নের জন্য নির্মিত। তাই নাটকের দলগুলোকে এখানে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। শিল্পকলা একাডেমির নিজস্ব কিছু অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য সময় বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। তবে নাচ, গান কিংবা অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য নাট্যশালার হল ব্যবহার না করাই ভালো।
তিনি বলেন, হল না পাওয়ায় অনেক নাটকের দলকে মঞ্চায়ন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বিষয়টি শিল্পকলা একাডেমির জরুরি ভিত্তিতে দেখা উচিত। একই সঙ্গে হলের আলোকব্যবস্থার দুরবস্থার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে বাল্ব লাগানোর হোল্ডার থাকলেও বাল্ব নেই, প্রয়োজনীয় আলোও পাওয়া যায় না। ফলে বাইরে থেকে লাইট ভাড়া করতে হয়, যা নাটকের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। সাউন্ড ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে ‘দুই পাখি ও নন্দিনী’ নাটকের সংলাপ দর্শকের কাছে পৌঁছানো নিয়েও সমস্যা হয়েছে বলে জানান তিনি।
নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতা মোহাম্মদ বারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাতীয় নাট্যশালার হল বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। তার অভিযোগ, নাটকের বাইরের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সংগঠনকে হল বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, অথচ নাটকের দলগুলোকে নিয়মিত মঞ্চায়নের সুযোগ পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
তিনি বলেন, জাতীয় নাট্যশালায় নাটক মঞ্চায়নের জন্য কারা অগ্রাধিকার পাবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি। নাটকের দলগুলোকে একসঙ্গে তিন থেকে ছয় মাসের হল বরাদ্দ দেওয়া হলে তাদের মঞ্চায়ন পরিকল্পনা করতে সুবিধা হবে। কিন্তু এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা আমলে নেওয়া হচ্ছে না।
মোহাম্মদ বারী আরও বলেন, দুপুর থেকে রাতের শিফটে দুটি প্রদর্শনী করলে দ্বিগুণ ভাড়া দেওয়ার নির্দেশনা যুক্তিহীন। তার মতে, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য আলাদা চার্জ নির্ধারণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি জাতীয় নাট্যশালায় নাটক ও অনুষ্ঠান আয়োজনের মানদন্ড নির্ধারণ এবং ইচ্ছামতো হল বরাদ্দের প্রবণতা বন্ধ করা প্রয়োজন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলা বিভাগের উপ-পরিচালক সরকার জিয়া উদ্দিন আহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, হল বরাদ্দের সিদ্ধান্ত একটি কমিটির মাধ্যমে নেওয়া হয়। নীতিমালা অনুযায়ী নাটকের দলগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও জাতীয়, আন্তর্জাতিক, সরকারি ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনুষ্ঠান থাকলে সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হয়।
নাটকের বাইরের গ্ল্যামার মিডিয়া বা শাহবাজ ফাউন্ডেশনের মতো সংগঠনকে হল বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে সরকার জিয়া উদ্দিন আহাম্মদ বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে এগুলোর পক্ষে না। এ ধরনের সংগঠনকে হল দেওয়া উচিত নয়।’ তিনি বলেন, এ ধরনের সংগঠনকে নিরুৎসাহিত করা এবং নিয়মিত নাট্যচর্চা করা দলগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত হল বরাদ্দের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় সংশ্লিষ্ট কমিটি।
শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্বে) মোহাঃ হারুন আর রশীদের বক্তব্য জানতে তার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
নাট্যকর্মীদের দাবি, শিল্পকলা একাডেমির হল বরাদ্দে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারিগরি সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান করতে হবে। তাদের মতে, নিয়মিত নাট্যচর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে জাতীয় নাট্যশালার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।