ইতিহাসে কিছু মানুষ থাকেন, যাদের জীবনকে বুঝতে গেলে অন্য একজন মানুষের দিকে তাকাতে হয়। আবার সেই অন্য মানুষটির জীবন বুঝতে গিয়ে আবিষ্কার করতে হয় প্রথম মানুষটিকেই। তারা যেন পরস্পরের আয়না একজনের মধ্যে অন্যজনের ছায়া পড়ে।
একজনের অসমাপ্ত প্রশ্ন অন্যজনের জীবনে নতুন ভাষা পায়। অধ্যাপক ড. সফিউদ্দিন আহমদকে স্মরণ করতে গিয়ে এই কথাটি নতুন করে মনে পড়ল। খুব ভালো করেই টের পাই, ডিরোজিওকে নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করতে করতে তিনি নিজেই একসময় হয়ে উঠেছিলেন ‘আমাদের ডিরোজিও’। শুধু লেখা বইয়ের পাতায় নয়, ডিরোজিওর কত গল্প শুনেছি তার মুখে আড্ডায়-বক্তৃতায়।
আমরা জানি, ইতিহাসের হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও আর বাংলাদেশের অধ্যাপক সফিউদ্দিন আহমদ পৃথক সময়ের মানুষ। তাদের জীবন, কর্মপরিসর ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা এক নয়। কিন্তু মানুষের চিন্তার ইতিহাসে কিছু আত্মীয়তা থাকে, যা ক্যালেন্ডারের দূরত্ব দিয়ে মাপা যায় না। যে শিক্ষক তার ছাত্রদের প্রশ্ন করতে শেখান, প্রচলিত বিশ্বাসের মুখোমুখি দাঁড়াতে শেখান, যুক্তির আলোয় সমাজ ও জীবনকে দেখতে উদ্বুদ্ধ করেন তার সঙ্গে ডিরোজিওর আত্মীয়তা খুঁজে পেতেতো খুব বেশি দূর যেতে হয় না।
অধ্যাপক সফিউদ্দিন আহমদের জন্মদিন আজ ১৯ অক্টোবর। এ বছর দিনটি এসেছে তাকে হারানোর পর প্রথমবার। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার চলে যাওয়ার পর প্রথম জন্মদিনে দাঁড়িয়ে তাই কেবল একজন বরেণ্য অধ্যাপক, গবেষক ও লেখককে স্মরণ করাই আমাদের কাজ নয়; ফিরে দেখা দরকার তার জীবন ও চিন্তার সেই দিকটি, যা তাকে তার সময়ের অন্য অনেক শিক্ষকের চেয়ে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল। তিনি শুধু তার সরাসরি ছাত্রদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন না, সরাসরি ছাত্র না হয়েও আমার মতো অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগীও ছিল তার। এমসি কলেজের ক্লাস ছাড়িয়ে সিলেটের শিবগঞ্জ কিংবা জিন্দাবাজারের বাসার আড্ডায় অংশ নিতে আমরা মুখিয়ে থাকতাম। স্যারের দেখানো পথেই আমাদের যাত্রা মুক্তচিন্তার অবারিত জগতের দিকে।
ডিরোজিও ছিলেন উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের এক বিস্ময়কর চরিত্র। মাত্র বাইশ বছরের জীবনে তিনি কলকাতার হিন্দু কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন, তা বাংলার চিন্তার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার প্রভাবিত তরুণদের পরিচয় হয়েছিল ‘ইয়ং বেঙ্গল’ নামে। তারা প্রচলিত সামাজিক বিশ্বাস, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশাসনকে প্রশ্ন করতে চেয়েছিলেন। তাদের সব চিন্তা কিংবা কর্ম যে সীমাবদ্ধতামুক্ত ছিল, তা নয়। কিন্তু তাদের মধ্যে যে প্রশ্ন করার সাহস জন্মেছিল, সেই সাহসই ছিল পরিবর্তনের অন্যতম পূর্বশর্ত।
ডিরোজিও নিছক পাঠদান করতেন না। তিনি শিক্ষার্থীদের সামনে এমন একটি জগৎ খুলে দিতে চেয়েছিলেন, যেখানে কোনো ধারণা শুধু প্রাচীন বলে সত্য নয়, কোনো বিশ্বাস শুধু প্রচলিত বলে প্রশ্নাতীত নয়। সত্যকে যাচাই করতে হবে, যুক্তিকে কাজে লাগাতে হবে, নিজের বুদ্ধিকে স্বাধীন করে তুলতে হবে। এই বোধই তাকে সময়ের প্রচলিত শিক্ষকের ধারণা থেকে আলাদা করে তোলে।
অধ্যাপক সফিউদ্দিন আহমদের মধ্যেও আমরা এই শিক্ষকসত্তার প্রতিধ্বনি খুঁজে পাই। তার পরিচয় শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না। শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে বৃহত্তর সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পরিসর প্রত্যক্ষ ছাত্রদের পাশাপাশি অসংখ্য অনুরাগী ও অনুসারীর মধ্যে তিনি মুক্তবুদ্ধি, আধুনিকতা ও প্রগতিশীল চিন্তার আকাক্সক্ষা জাগিয়ে তুলেছিলেন। তার কাছে সাহিত্য ছিল শুধু পরীক্ষার বিষয় নয়, জীবনকে বোঝার একটি পথ; গবেষণা ছিল শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়, প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে যাচাই করার অনুশীলন। তার পাঠ ও বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা যে চিন্তার জগতে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলেন, সেটিই তার শিক্ষকজীবনের অন্যতম বড় উত্তরাধিকার।
১৯৪১ সালের ১৯ অক্টোবর নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার পূর্বপাড়ায় তার জন্ম। রায়পুরার আর কে আর এম উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি ঢাকা কলেজে পড়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পরে ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি অর্জনের পর বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্রসাহিত্য নিয়ে উচ্চতর অধ্যয়ন করেছেন। তার শিক্ষাজীবনের এই বিস্তারই হয়তো তাকে বাংলা সাহিত্যের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বসাহিত্য, দর্শন ও তুলনামূলক সমালোচনার বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে গিয়েছিল।
তার কর্মজীবনের বিস্তারও ছিল উল্লেখযোগ্য। নেত্রকোনা কলেজ, বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ, ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ, সিলেটের এমসি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন তিনি। পরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার দীর্ঘ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা তাকে শুধু পাঠদানের মানুষ করে রাখেনি; বরং শিক্ষার্থী ও পাঠকের সঙ্গে জ্ঞানচর্চার সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ করে দিয়েছিল। তবে শিক্ষকতা জীবনের একটি বড় অংশ যেহেতু কেটেছে সিলেটে, তাই আত্মিক যোগাযোগ ছিল সেই এলাকার মাটি ও মানুষের সঙ্গে। সিলেটে ৮০ থেকে ৯০ দশকের এমন কোনো সিরিয়াস লেখক পাওয়া যাবে না যার সঙ্গে সফিউদ্দিন আহমদের যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি।
তবে তার বৌদ্ধিক পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ডিরোজিও ও ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন নিয়ে গবেষণা। ‘ডিরোজিও : জীবন ও সাহিত্য’ এবং ‘ইয়ং বেঙ্গল মুভমেন্ট ও ডিরোজিও’ গ্রন্থের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলার নবজাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নতুন করে পাঠকের সামনে হাজির করেছেন। ডিরোজিওকে তিনি কেবল ঔপনিবেশিক কলকাতার একজন কবি বা শিক্ষক হিসেবে দেখেননি; তার জীবন, সাহিত্য, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং প্রতিবাদী চিন্তার মধ্য দিয়ে সময়ের সমাজ ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তনকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। এখানেই সফিউদ্দিন আহমদের গবেষণা তার ব্যক্তিগত পাণ্ডিত্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর তাৎপর্য অর্জন করে। ডিরোজিওকে নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে তিনি আসলে আমাদের সামনে এমন এক প্রশ্নও রেখে গেছেন, যা প্রতিটি প্রজন্মের জন্য জরুরি : শিক্ষা কি মানুষকে শুধু প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার উপযোগী করে তুলবে, নাকি সেই ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার সাহসও দেবে?
তার সাহিত্য ও গবেষণার জগৎ অবশ্য ডিরোজিওতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিদ্যাসাগর, বাংলা নবজাগরণ, ভাষা, শিক্ষাচিন্তা, তুলনামূলক সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্য বিভিন্ন বিষয়ে তার রচনা বিস্তৃত। তিনি গবেষক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। তার প্রকাশিত মৌলিক, অনূদিত, সহরচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক।
রবীন্দ্র গবেষণায় বাংলা একাডেমি রবীন্দ্র পুরস্কার ২০১৯ এবং সাংস্কৃতিক গবেষণায় শিল্পকলা পদক ২০২২ তার কাজের জাতীয় স্বীকৃতি। জীবদ্দশায় তিনি একুশে পদক কিংবা স্বাধীনতা পদকও পেতে পারতেন। তবে আজকের আলোচনা সেটা না। একজন গবেষকের প্রকৃত মূল্যায়ন কেবল পুরস্কারের তালিকায় সম্পন্ন হয় না। তার কাজ কতটা নতুন চিন্তার জন্ম দিয়েছে, কতজন পাঠক ও শিক্ষার্থীকে নতুন অনুসন্ধানে উৎসাহিত করেছে, কতটা গভীরভাবে আমাদের সাহিত্যবোধ ও ইতিহাসচেতনাকে প্রভাবিত করেছে সেই বিচারটাই জরুরি। সফিউদ্দিন আহমদ সেখানে সর্বোচ্চ পুরস্কারটি পেয়েই আছেন।
তার শিক্ষকতা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি যোগসূত্র ছিল জ্ঞানচর্চাকে তিনি কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের বিষয় হিসেবে দেখেননি, বৃহত্তর সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের সঙ্গেও যুক্ত রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি। ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন ।
একজন শিক্ষক তার ছাত্রদের মধ্যে কী রেখে যান? পাঠ্যসূচি শেষ হয়ে যায়, পরীক্ষা শেষ হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়ও একসময় স্মৃতিতে মিলিয়ে যায়। কিন্তু একজন প্রকৃত শিক্ষকের রেখে যাওয়া প্রশ্ন শিক্ষার্থীর ভেতরে থেকে যায়। কখনো তা তাকে প্রতিষ্ঠিত ধারণার সঙ্গে দ্বিমত করতে শেখায়, কখনো নতুন বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করে, কখনো সমাজের অন্যায় ও অসঙ্গতির সামনে নীরব না থাকার সাহস দেয়। শিক্ষকতার এই উত্তরাধিকার কোনো সনদে লেখা থাকে না; তা ছড়িয়ে থাকে মানুষের চিন্তা ও জীবনযাপনে। তাই ডিরোজিওর সঙ্গে তার তুলনা শুধু একটি আকর্ষণীয় উপমা নয়। তাকে স্মরণ করতে গিয়ে তাই শুধু তার লেখা বইগুলোর কথা বললে চলবে না, তার প্রভাবিত মানুষগুলোর কথাও বলতে হবে। তার প্রত্যক্ষ ছাত্র, তার অনুরাগী, তার সঙ্গে সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিসরে যুক্ত মানুষ এবং তার বই পড়ে অনুপ্রাণিত নতুন প্রজন্ম তাদের মধ্যে যদি মুক্তবুদ্ধির চর্চা অব্যাহত থাকে, তবে সেটিই হবে তার জীবনসাধনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ স্বীকৃতি।
আজকের বাংলাদেশে এই উত্তরাধিকারের প্রয়োজন আরও গভীর। যখন মতভিন্নতাকে অনেক সময় বিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়, যখন যুক্তির বদলে আবেগ কিংবা আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়, তখন একজন মুক্তবুদ্ধির শিক্ষকের কথা নতুন করে মনে পড়ে। আধুনিকতা মানে শুধু নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার নয়; আধুনিকতা মানে নিজের চিন্তাকে যাচাই করা, অন্যের যুক্তি শোনা, ভুল স্বীকার করার সাহস অর্জন করা এবং মানুষের মর্যাদাকে সব সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া।
সফিউদ্দিন আহমদের জীবন ও কাজ আমাদের সেই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি ডিরোজিওকে নিয়ে গবেষণা করেছেন, কিন্তু তার গুরুত্ব কেবল ডিরোজিও-গবেষক হিসেবে নয়। তিনি নিজেও একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর তৈরি করেছেন, যেখানে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও সমাজ নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল। ডিরোজিওর ছাত্ররা যেমন তাদের শিক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া চিন্তার আলো নিয়ে নিজেদের সময়ের সঙ্গে লড়েছিলেন, তেমনি সফিউদ্দিন আহমদের ছাত্র-অনুসারীদেরও দায়িত্ব তার কাছ থেকে পাওয়া সেই আলোকে বহন করে এগিয়ে যাওয়া।
মৃত্যুর পর প্রথম জন্মদিনে একজন মানুষকে স্মরণ করার অর্থ তার অনুপস্থিতিকে মেনে নেওয়া, কিন্তু তার কাজকে অনুপস্থিত হতে না দেওয়া। তার চিন্তা আর গবেষণাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে, তার কাজের মূল্যায়ন যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন তার রেখে যাওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে আরও বিস্তৃত করা। তার প্রয়াণ-পরবর্তী প্রথম জন্মদিনে আমাদের প্রত্যাশা তিনি যে মুক্তচিন্তার দরজা খুলে দিয়েছিলেন, তা যেন কখনো বন্ধ না হয়।
____________
মুস্তাফিজ শফি : সম্পাদক, দেশ রূপান্তর ও বহুমাত্রিক লেখক।