রিসোর্টের মালিক দুজন অথচ আসামি হলেন একজন

মামলায় অসঙ্গতির অভিযোগ

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৪ এএম

কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টটি যৌথভাবে গড়ে তুলেছিলেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পূর্ব গোমদ-ী গ্রামের মো. তানভীর সুলতান মিয়া ও একই এলাকার নিয়াজ মোর্শেদ। শনিবার রিসোর্টটিতে ভয়াবহ আগুনে ভস্মীভূত হওয়ার পর রাতেই এ ঘটনায় উখিয়া থানায় একটি মামলা হয়। মামলায় তানভীরকে প্রধান আসামি করা হলেও আরেক মালিক নিয়াজকে আসামি করা হয়নি। তা ছাড়া অবহেলাজনিত মৃত্যুর আইনে দায়ের হওয়া মামলার ধারায়ও রয়েছে অসঙ্গতি। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন মামলার ধারা দুর্বল করে দিয়ে পুলিশ অভিযুক্ত পক্ষকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।

টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের ঘটনায় রিসোর্টে থাকা ১১ জন নিখোঁজ থাকলেও উদ্ধার হয়েছে ১০ মরদেহ। ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও অপরজনের কোনো হদিস পায়নি প্রশাসন।

এদিকে, কক্সবাজার জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নিহতদের পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত মরদেহগুলোর ময়নাতদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ১০ জনের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গের হিমাগারে রাখা হয়েছে।

এ ঘটনায় আটক সুমনকে রবিবার বিকেলে আদালতে তোলা হয়। পুলিশ বলেছে, সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। এদিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিএনএর স্যাম্পল নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করায় রিমান্ড শুনানি হয়নি।

মামলার এজাহার থেকে পাওয়া তথ্যমতে, আগুনের ঘটনায় শনিবার রাত ৯টায় উখিয়া থানার এসআই আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে অবহেলাজনিত মৃত্যুর আইনে থানায় ২৩ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। এতে রিসোর্টের এক মালিক ও তিন ব্যবস্থাপকসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে এবং ১৯ জন কর্মচারীকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। এজাহারনামীয় আসামিরা হলেন রিসোর্ট মালিক মো. তানভীর সুলতান মিয়া (৩৮),  প্রধান ব্যবস্থাপক বরিশালের সাঈদ আহাম্মেদ (৩২), ব্যবস্থাপক  মোহাম্মদ সাঈদ (৩০) এবং সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমন (২৯)।  তবে এজাহারে রিসোর্টের অন্যতম অংশীদার  নিয়াজ মোর্শেদের নাম নেই। এজাহারে আরও  উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে রিসোর্টটির সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমনকে (২৯) আটক করা হয়। সুমনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, রিসোর্টটির মালিক  ও অন্য ব্যবস্থাপকরা পলাতক রয়েছেন।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ফায়ার সার্ভিস টিমের সঙ্গে আলোচনাকালে জানা যায়, টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট কোনো ফায়ার লাইসেন্স সংগ্রহ করেনি। তবে এজাহারে ফায়ার সার্ভিসের সতর্ক করে দেওয়া নোটিসের উল্লেখ করেননি বাদী।

এ বিষয়ে  ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টেশন অফিসার দোলন আচার্য্য বলেন, ‘পুলিশকে আমরা ঘটনার দিনেই জানিয়েছি যে, রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে আমরা সতর্ক করে নোটিস দিয়েছিলাম। এখন কেন তারা এজাহারে এটি লেখেননি সেটি তারাই ভালো বলতে পারবে।’

এজাহারে ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া নোটিস এবং রিসোর্ট মালিককে কেন আসামি করা হয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে মামলার বাদী এসআই আশীষ সূত্রধর বলেন, আমি পূজার ছুটিতে আছি। পূজা শেষে আগামী ২৭-২৮ অক্টোবর ফিরব। এরপর আপনি থানায় আসেন, কথা হবে।

এদিকে এত মর্মান্তিক একটি ঘটনায় করা মামলায় মালিককে বাদ দেওয়া এবং সুনির্দিষ্ট ধারার প্রয়োগ না করায় বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, মামলার ধারা দুর্বল করে দিয়ে পুলিশ অভিযুক্ত পক্ষ বাঁচানোর চেষ্টা করছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার আদালতের আইনজীবী ইউসুফ আরমান বলেন, ‘একটি অগ্নিকান্ড। সেখানে দায়সারা মামলা। এটি পুলিশের কা-জ্ঞানহীনতা।’ তিনি আরও বলেন, ‘রিসোর্টটি যৌথ মালিকানার সেটি সবাই জানে। কিন্তু একজনকে আসামি করা এবং অন্যজনকে বাদ দেওয়া রহস্যজনক। এ ছাড়া নিরীহ কর্মচারীদের অজ্ঞাতনামা আসামি করাও আইনবহির্ভূত।’

আইনজীবী আরও বলেন, ‘গণমাধ্যমের মাধ্যমে ঘটনার দিন থেকেই দেশবাসী জানতে পারে, গত জুন মাসে ফায়ার সার্ভিস রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে নোটিস দেয়। কিন্তু  পুলিশ এই কথাটি  এজাহারে উল্লেখ না করায় মামলাটি দুর্বল হয়ে গেছে। এখন যে  ৩০৪ (ক) ধারায় মামলা হয়েছে সেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর। অথচ ফায়ার সার্ভিসের বলা কথাটি যদি তারা এজাহারে উল্লেখ করতেন সেক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হতো যাবজ্জীবন ও সর্বনিম্ন ১০ বছর।’

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, ‘এই রিসোর্টে আগুন লাগা, মানুষের মৃত্যু প্রমাণ করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অবহেলার বিষয়। অনুমোদন ছাড়া ভবন হয় কী করে, ফায়ার লাইসেন্স ও পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া প্রতিষ্ঠান এতদিন চলল কী করে? প্রশাসনের অনুমোদন না থাকার পরও রিসোর্টটি সচল কে করেছিল। এসবই দায়িত্বহীনতার প্রমাণ। এখন ঘটনা ঘটার পর এক মালিককে বাদ দিয়ে অন্য জনকে  আসামি করা,  দমকল বাহিনীর দেওয়া তথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ না করা আরেক দায়িত্বহীনতা। মূল কথা সমাজের দায়িত্ববানরা যদি দায়িত্ব পালন না করে তবে বিপর্যয় নেমে আসবেই।’

উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, মামলাটি যখন রুজু হয় তখন পুলিশ নিয়াজ মোর্শেদের নাম জানত না। এই কারণে এজাহারে আপাতত তার নাম দিই। তবে এই মামলায় তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এটা নিশ্চিত। তিনি আরও বলেন, এটি এজাহার। এখানে যদি কোনো ভুল থাকে, অসঙ্গতি থাকে তা চার্জশিটে সংযোজন করা হবে।

এখনো হদিস মেলেনি একজনের : অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ১১ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করছেন স্বজনরা। তবে ঘটনার দিন ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার এর তিন দিন পেরিয়ে গেলেও অপরজনের কোনো হদিস পাননি প্রশাসন। ১০ মরদেহ উদ্ধারের পর ফায়ার সার্ভিস শনিবার বিকেল ৪টায় সেখানে অভিযান শেষ করে। নানাভাবে একজন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়ার পর রবিবার বিকেলেও পোড়া রিসোর্টে অভিযান চালায় ফায়ার সার্ভিস। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক ( প্রশাসন ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল আজাদ আনোয়ার বলেন, ‘কিন্তু দুর্ঘটনাস্থল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আমাদের ভালোভাবে তল্লাশি চালানোর আগেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে হয়।’

মরদেহ হিমাগারে, হচ্ছে না ময়নাতদন্ত : ১০ জনের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসাপাতাল মর্গের হিমাগারে রাখা হয়েছে। তবে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত ওইসব মরদেহের ময়নাতদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক  ডা. সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, রবিবার বিকেলে আমরা মরদেহ থেকে ডিএনএর স্যাম্পল সংগ্রহ করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে দিয়েছি। কিন্তু এর ময়নাতদন্ত করিনি।

তিনি আরও বলেন, নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্র্রেট বরাবরে ময়নাতদন্ত না করার আবেদন করা হয়েছে। আর আমরা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশনা মতো কাজ করছি।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, আমরা পাঁচটি মরদেহের ময়নাতদন্ত না করার আবেদন পেয়েছি। এ ছাড়া আরও কিছু আবেদন কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে বলে খবর পেয়েছি। তবে আমরা এখনো নিশিচত নই কোন মরদেহ কার। যারা আবেদন করছেন সেই মরদেহগুলো যে তাদের স্বজনদের তা নিশ্চিত হওয়া আগে জরুরি। তাই ডিএনএ প্রতিবেদন না পাওয়ার আগে আমরা কোনো আবেদন বিবেচনায় নেব না। তবে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিবেদন পাওয়ার আগ পর্যন্ত ময়নাতদন্ত করা হচ্ছে না।

উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, এটি সরাসরি হত্যা মামলা নয়। তাই এই মামলার ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত না হলে তেমন আইনি জটিলতা তৈরি হবে না।

গ্রেপ্তার সুমনের ৭ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ : আটক রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমনের সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ। পুলিশ ও আদালত থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, উখিয়া থানায় দায়ের করা মামলার ৪ নম্বর আসামি সুমনকে রবিবার আদালতে পাঠায় পুলিশ। পরে আদালতে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। মামলার কাজে ডিএনএর স্যাম্পল নিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকায় অবস্থান করায় রিমান্ড শুনানি হয়নি।

কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহাজাহাল এলাহী নূরী বলেন, কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মুহাম্মদ আসিফের আদালতে রবিবার সুমনকে তোলা হয়। কিন্তু রিমান্ড শুনানিতে তদন্ত কর্মকর্তার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। সেই কারণে আদালত শুনানি না করে সুমনকে কারাগারে পাঠিয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা যেদিন সশরীরে উপস্থিত হয়ে রিমান্ড শুনানির আবেদন করবে সেদিনই শুনানি হবে। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত