কুষ্টিয়ায় কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের তিন দিনের অনুষ্ঠানের শেষ দিন ছিল গতকাল সোমবার। এরই মধ্যে আখড়াবাড়ি থেকে একটি টাইমবোমা ও দুই বোতল পেট্রোল উদ্ধার করেছে কুমারখালী থানা পুলিশ। গত রবিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে এসব বিস্ফোরকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। গতকাল সকাল ৮টার দিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) এসআরইউ ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রীয়করণ টিম এসে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে। বোমার খবর শোনার পর থেকেই সাধু-ভক্তরা আতঙ্কিত হয়ে দিকদ্বিক ছোটাছুটি শুরু করে। অনেকে তাদের অসমাপ্ত গুরুভক্তির সমাপন ছাড়াই ধাম ছেড়ে চলে গেয়ে।
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন গতকাল জানান, রাতে পুলিশ কন্টোলরুমে একজন সাধু গিয়ে তাকে জানান যে, ককটেলের মতো একটি বস্তু দেখা যাচ্ছে। তৎক্ষণাৎ তিনি গিয়ে বোমাসদৃশ বস্তুটি দেখতে পান। এ সময় নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে সবাইকে আখড়াবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, একটি সাদা রঙের ব্যাগে একটি লাল রঙের টেপ দিয়ে জড়ানো বোমাসদৃশ বস্তু, ২ লিটার পেট্রোল এবং দুটি সার্কিট পাওয়া যায়। পরে ঢাকার বোম্ব ডিসপোজাল টিমকে খবর দিলে তারা সকাল ৭টায় লালন আখড়াবাড়িতে এসে পৌঁছায় এবং এটি টাইমবোমা হিসেবে শনাক্ত করে তা নিষ্ক্রিয় করে।
ওসি জানান, যারা আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য এ কাজ করেছে সিসি ক্যামেরা ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। শিগগির জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে।
ঘটনাস্থলের প্রত্যক্ষদর্শী কল্পনা খাতুন বলেন, ‘রাতে হঠাৎ সন্দেহজনক ওই বোমার ব্যাগ দেখতে পেয়ে দৌড়ে গিয়ে পুলিশকে জানালেও পুলিশ তাতে গুরুত্ব দেয়নি। সাঁইজির মাজার এলাকায় কারা এই বোমা রাখল, তার কোনো সন্ধান না করে উল্টা নিরাপত্তার কথা বলে ধামের সব সাধু-ভক্তদের বের করে দিয়ে সারা রাত বাহিরে দাঁড় করিয়ে রেখে চরম অপমানিত করা হয়েছে। এত শত শত পুলিশ, র্যাব, আনসার থেকে কী লাভ হলো?’
ঘটনাস্থলের সাথেই অনুষ্ঠানের প্রথম দিন থেকে আসন গ্রহণকারী গোলাম সরোয়ারের অভিযোগ ‘বোমার মতো দেখতে বস্তুটি দেখেই আমি ছুটে যাই পুলিশ ডাকতে। কিন্তু কোনো পুলিশই আমার কথা পাত্তা দেয়নি। গেটের পুলিশ বলে কন্ট্রোল রুমে জানাতে, সেখানে গেলে তারা বলে ডিএসবিকে জানাতে, পরে সাদা পোশাকের ডিএসবির পুলিশকে বল্লে তারা বলে আজ আমাদের ডিউটি শেষ, বলেই অন্য পুলিশকে দেখিয়ে দেয়। শেষে এক পুলিশ অফিসার আমাকে আতঙ্কিত হতে দেখে ঘটনাস্থলে এসে দেখার পর উনি তখন অন্য পুলিশ অফিসারদের মোবাইল করে জানান। এত বড় আয়োজনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের দায়িত্বহীনতা দেখেই আমাদের সাধু গুরুরা হতাশ ও আতঙ্কে যে যেমন পেরেছে ধাম ছেড়ে চলে গিয়েছে। আমি এই ঘটনার তদন্ত ও জড়িতদের বিচার দাবি করছি।’
এদিকে লালন মাজার প্রাঙ্গণে বোমা উদ্ধার হওয়ায় ভেতরের সাধুদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রাতে মূল মাজার আঙিনা থেকে সবাইকে বের করে দিয়ে প্রধান ফটক বন্ধ রাখা হয়। কাউকে মাজারের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ফকির সামসুলের।
লালন ভক্ত ও সাধুদের অভিযোগ, ‘এবারের আয়োজনের ব্যবস্থাপনায় নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও সাধু-ভক্তরা সেসবে নজর না দিয়ে সাঁইজি ধামে আসার মূল উদ্দেশ্য গুরু-শিষ্যের সান্নিধ্যকে প্রাধান্য দিয়েছে। অব্যবস্থাপনার একটা বড় নজির এরই মধ্যে সবার নজরে এসেছে বোমা উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। আখড়াবাড়িতে জীবনে কোনোদিন যা ঘটেনি, আজকে তাই ঘটে গেল। এই বোমার খবর শোনার পর থেকেই আগত সাধু-ভক্তরা আতঙ্কিত হয়ে দিকদ্বিক ছোটাছুটি শুরু করেছিল। এতে সাধুরা তাদের অসমাপ্ত গুরু ভক্তির সমাপন ছাড়াই ধাম ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। শত বছর ধরে চলে আসা সাধুদের এই সেবা কর্যক্রম বন্ধ করার জন্য এটি একটি পরিকল্পিত ঘটনা।’
কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলামের দেওয়া তথ্যমতে, লালন মেলায় ৮৭২ পুলিশ সদস্য নিয়োজিত রয়েছে। এ ছাড়া জেলার বাইরে থেকেও পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে আসা হয়েছে। তিন স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে অনুষ্ঠান সফল করার সব আয়োজন সম্পন্ন ছিল।
উল্লেখ্য. ফকির লালন সাঁইয়ের মাজার প্রাঙ্গণে সাধুদের কার্যক্রমের সঙ্গে লালন মেলার কোনো সম্পর্ক নেই। সাধু-ভক্তরা তাদের রীতিনীতি মেনে সাধুসঙ্গ শেষ করে আবার আপন ঠিকানায় চলে যায়। সাধু-গুরুরা পুণ্যসেবা গ্রহণ শেষে রবিবার বিকেল থেকেই ফিরতে শুরু করেছিল; শুধুমাত্র দূর-দূরান্ত থেকে আগত সাধুরা রাতে ছিল, তাদের সকালে রওনা দেওয়ার কথা ছিল। প্রতি বছর এই দিবসটি ঘিরে লালন একাডেমি ও জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মেলার নামে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটায় অনেকটাই দুর্ভোগ পোহাতে হয় লালন ভক্তদের।