সুখের চিরস্থায়ী আবাস

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৫৬ এএম

মানবজীবনের চূড়ান্ত সাফল্য কোথায়? সম্পদ, প্রাচুর্য, ক্ষমতা কিংবা খ্যাতির মধ্যে? নাকি এমন এক জীবনে, যেখানে নেই দুঃখের ছায়া, মৃত্যুর ভয়, বার্ধক্যের ক্লান্তি কিংবা বিচ্ছেদের বেদনা? ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত সাফল্য হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তার অনুগ্রহে চিরশান্তির আবাস জান্নাত লাভ করা। জান্নাত এমন অনুপম জগৎ, যার সৌন্দর্য, সুখ-সমৃদ্ধি ও নেয়ামতের পূর্ণাঙ্গ চিত্র মানুষের কল্পনায় ধারণ করা সম্ভব নয়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে জান্নাতের যে বর্ণনা এসেছে, তা মুমিনের হৃদয়ে পরকালীন জীবনের প্রতি গভীর আকাক্সক্ষা সৃষ্টি করে।

চিরশান্তির আবাস : জান্নাতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর চিরস্থায়িত্ব। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রাসাদও একদিন জীর্ণ হয়, ফুলের সৌন্দর্য মøান হয়, প্রিয়জনের সান্নিধ্য বিচ্ছিন্ন হয়। কিন্তু জান্নাতের সুখ-সৌন্দর্যের কোনো অবসান নেই। সেখানে নেই ক্লান্তি, অবসাদ কিংবা মৃত্যু। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেখানে তারা কোনো ক্লান্তি অনুভব করবে না এবং সেখান থেকে তাদের বহিষ্কারও করা হবে না।’ (সুরা হিজর ৪৮)

জান্নাতের অধিবাসীরা সেখানে নিরাপদ, প্রশান্ত ও সম্মানিত জীবন লাভ করবেন। পৃথিবীর জীবনে যারা দারিদ্র্য, অসুস্থতা, শোক, বঞ্চনা কিংবা নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দিন কাটিয়েছেন, জান্নাতে আল্লাহর রহমতে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে অতুলনীয় পুরস্কার। তবে জান্নাত লাভের মূল চাবিকাঠি হলো ইমান, আল্লাহর রহমত এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সৎকর্মে আত্মনিয়োগ।

সবুজ উদ্যান ও প্রবহমান নদী : পবিত্র কোরআনে জান্নাতের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে বারবার উদ্যান, ছায়া ও প্রবহমান নদীর কথা বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত।’ (সুরা বুরুজ ১১)

জান্নাতের নদীগুলোর বর্ণনায় কোরআন উল্লেখ করেছে স্বাদ-গন্ধের পরিবর্তনহীন পানির নদী, স্বাদ অক্ষুণœ দুধের নদী, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু পানীয়ের নদী এবং পরিশোধিত মধুর নদীর কথা। (সুরা মুহাম্মদ ১৫)

এসব বর্ণনা জান্নাতের অপূর্ব নেয়ামত এবং মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার পরিচয় বহন করে। সেখানের পরিবেশ হবে প্রশান্তিদায়ক এবং প্রতিটি দৃশ্য হবে হৃদয় জুড়ানো।

সুস্বাদু খাবার : পৃথিবীতে মানুষের জীবনধারণের জন্য খাদ্য অপরিহার্য। কিন্তু জান্নাতের খাদ্য শুধুই ক্ষুধা নিবারণের উপকরণ নয়। বরং তা আনন্দ, তৃপ্তি ও সম্মানের অংশ। পবিত্র কোরআনে জান্নাতের ফলমূল, পছন্দসই খাদ্য এবং বিচিত্র নেয়ামতের উল্লেখ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেখানে থাকবে ফলমূল এবং তারা যা চাইবে।’ (সুরা ইয়াসিন ৫৭)

জান্নাতের খাদ্য ও পানীয়ের প্রকৃত স্বরূপ দুনিয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে পুরোপুরি তুলনীয় নয়। কোরআনের বর্ণনা আমাদের জানিয়ে দেয়, আল্লাহ তার মুমিন বান্দাদের জন্য এমন সব নেয়ামত প্রস্তুত রেখেছেন, যা তাদের আনন্দ ও তৃপ্তিকে পূর্ণতা দেবে। সেখানে অভাব-অনটন কিংবা জীবিকার দুশ্চিন্তা থাকবে না।

সম্মানজনক জীবন : জান্নাতের অধিবাসীদের জন্য রয়েছে মনোরম আবাস, আরামদায়ক আসন, সুন্দর পোশাক ও সম্মানজনক জীবন। কোরআনে জান্নাতিদের রেশমি পোশাক পরিধান এবং স্বর্ণের অলংকারে সজ্জিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। (সুরা হজ ২৩)

দুনিয়ার জীবনে মানুষ সম্মান ও মর্যাদা অর্জনের জন্য কত চেষ্টা করে! কিন্তু প্রকৃত সম্মান হলো আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া। জান্নাতের সম্মান কোনো ক্ষণস্থায়ী সামাজিক মর্যাদা নয়, তা মহান আল্লাহর অনুগ্রহে অর্জিত চিরস্থায়ী পুরস্কার। সেখানে মানুষের অন্তরে অহংকার, হিংসা কিংবা বিদ্বেষ থাকবে না। বরং থাকবে পবিত্রতা, প্রশান্তি ও পারস্পরিক ভালোবাসা।

হৃদয়ের প্রশান্তি : মানুষের জীবনে প্রিয়জনের সান্নিধ্য অত্যন্ত মূল্যবান। দুনিয়ায় মৃত্যু, দূরত্ব ও বিচ্ছেদ মানুষের আনন্দকে অনেক সময় বিষাদে পরিণত করে। জান্নাতের অন্যতম সুসংবাদ হলো, আল্লাহর অনুগ্রহে নেককার মুমিনদের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ থাকবে। পবিত্র কোরআনে সৎকর্মশীল মুমিনদের সঙ্গে তাদের নেককার পিতা-মাতা, জীবনসঙ্গী ও সন্তানদের জান্নাতে প্রবেশের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। (সুরা রাদ ২৩)

জান্নাতের জীবন হবে পবিত্র ও কলুষমুক্ত। সেখানে কোনো বিদ্বেষ, প্রতারণা কিংবা মনোমালিন্য থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের অন্তর থেকে সমস্ত বিদ্বেষ দূর করে দেব।’ (সুরা আরাফ ৪৩) এ আয়াত জান্নাতি জীবনের মানসিক প্রশান্তি ও হৃদয়ের পবিত্রতার অনুপম চিত্র তুলে ধরে।

দুঃখের অবসান : পৃথিবীর জীবন পরীক্ষার ক্ষেত্র। এখানে সুখের পাশাপাশি দুঃখ, সুস্থতার পাশাপাশি অসুস্থতা এবং মিলনের পাশাপাশি বিচ্ছেদ রয়েছে। কিন্তু জান্নাতের জীবন এসব সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। সেখানে জান্নাতিরা চিরস্থায়ী নিরাপত্তা ও প্রশান্তি লাভ করবেন। ইবনে ওমর (রা.) ধেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জান্নাতিরা জান্নাতে আর জাহান্নামিরা জাহান্নামে যাওয়ার পর মৃত্যুকে উপস্থিত করা হবে, এমনকি জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্য স্থানে রাখা হবে। এরপর তাকে জবাই করে দেওয়া হবে। অতঃপর একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেবে যে, হে জান্নাতিরা! আর মৃত্যু নেই। হে জাহান্নামিরা! আর মৃত্যু নেই। তখন জান্নাতিদের বাড়বে আনন্দের ওপর আনন্দ। আর জাহান্নামিদের বাড়বে দুঃখের ওপর দুঃখ। (সহিহ বুখারি ৬৫৪৮)

মৃত্যুর অবসান ও অনন্ত জীবনের এই ঘোষণা জান্নাতের অধিবাসীদের আনন্দকে পূর্ণতা দেবে। সেখানে হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকবে না, জীবনের অবসান নিয়ে উদ্বেগ থাকবে না, থাকবে চিরস্থায়ী নিরাপত্তা।

জান্নাতের শ্রেষ্ঠ নেয়ামত : জান্নাতের উদ্যান, নদী, ফলমূল, প্রাসাদ ও অন্যান্য নেয়ামত নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। কিন্তু এসব নেয়ামতের ঊর্ধ্বে রয়েছে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর আল্লাহর সন্তুষ্টি সর্বাপেক্ষা মহান।’ (সুরা তওবা ৭২)

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা অনুসারে, জান্নাতের মুমিনরা মহান আল্লাহকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করবেন। এর স্বরূপ মানুষের জ্ঞানের সীমার বাইরে। আল্লাহর মহিমার উপযোগীভাবেই এ দিদার সংঘটিত হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সেদিন অনেক মুখমণ্ডল হবে উজ্জ্বল, তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে।’ (সুরা কিয়ামাহ ২২-২৩) হাদিসেও জান্নাতিদের জন্য মহান আল্লাহর দিদার লাভের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। অতএব, জান্নাতের সর্বোচ্চ সৌভাগ্য হলো মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তার দিদার লাভের অনুগ্রহ অর্জন করা।

এখনই প্রস্তুতি : জান্নাতের নেয়ামতের আলোচনা কেবল কৌতূহল মেটানোর জন্য নয়। বরং তা মানুষের জীবনকে সংশোধন করার আহ্বান। জান্নাত লাভের প্রত্যাশী ব্যক্তিকে বিশুদ্ধ ইমান, ফরজ ইবাদত, নামাজ, রোজা, হালাল উপার্জন, পিতা-মাতার সেবা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতি যতœবান হতে হবে। পাশাপাশি মিথ্যা, প্রতারণা, অহংকার, হিংসা, জুলুম ও হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

মনে রাখতে হবে, আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহই নাজাতের প্রধান মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন, আল্লাহর রহমত ছাড়া শুধু আমলের বিনিময়ে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। (সহিহ বুখারি ৬৪৬৩)

জান্নাতের নেয়ামত সম্পর্কে হাদিসে কুদসিতে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আমার নেককার বান্দাদের জন্য এমন সব নেয়ামত প্রস্তুত করে রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তরেও কল্পনা উদয় হয়নি।’ (সহিহ বুখারি ৪৭৭৯)

সুতরাং দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবনকে বিস্মৃত হওয়া উচিত নয়। সম্পদ, পদমর্যাদা ও পার্থিব সাফল্য একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ইমান ও নেক আমলের প্রতিদান আল্লাহর অনুগ্রহে পরকালে চিরস্থায়ী কল্যাণের কারণ হতে পারে। আমাদের প্রত্যেকের উচিত জান্নাত লাভের আকাক্সক্ষা হৃদয়ে ধারণ করা, আল্লাহর রহমতের আশা রাখা এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনে জীবন পরিচালনা করা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইমানের সঙ্গে জীবনযাপন, নেক আমলের তওফিক এবং তার রহমতে জান্নাতুল ফেরদাউস লাভের সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।

লেখক : আরবি প্রভাষক, মাদ্রাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত