নেপালের বিপর্যয়ের শিক্ষা: বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি, আর্থিক প্রস্তুতি ও কপ-৩১

বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি—নিচু বদ্বীপভূমি, দীর্ঘ উপকূল ও ঘনবসতির কারণে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে। ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার কারণে কৃষিখাতের জিডিপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএম

গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের রসুয়া জেলায় লাংতাং লিরুং পর্বতাঞ্চলে হিমবাহের বিশাল অংশ ধসে পড়ে। প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে নেমে সেই ধস ভোতেকোশি নদীতে সাময়িক বাঁধ তৈরি করে, যা ভেঙে নেমে আসে পানি, কাদা ও পাথরের ভয়াবহ স্রোত। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এটি ভূমিকম্প নয়, বরং হিমবাহ ও শিলাস্তরের ধস থেকেই এই ভূকম্পনসদৃশ শক্তি তৈরি হয়েছিল।

ঘটনার প্রায় এক মাস পর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানান, এই দুর্যোগে অন্তত ১ হাজার ৪৫০ জন নিহত হয়েছেন এবং সড়ক, সেতু, স্কুল, ঘরবাড়ি ও মানুষের জীবিকা ভেসে গেছে, যা দেশটির উন্নয়ন অগ্রগতিকে ব্যাহত করেছে। তিনি পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে ঋণের বদলে অনুদানভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহায়তার জোরালো আহ্বান জানান।

নেপালের অর্থমন্ত্রী স্বর্ণিম ওয়াগলের হিসাবে, পুনর্গঠনে প্রয়োজন হতে পারে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার—যা ২০১৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পুনর্গঠন ব্যয়ের (প্রায় ৯০০ কোটি ডলার) তুলনায় কম হলেও দেশটির অর্থনীতির জন্য বিশাল চাপ। বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে জরুরি ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ১৭ কোটি ডলার অর্থায়নের ব্যবস্থা করেছে, যার মধ্যে ১ কোটি ডলার তাৎক্ষণিক ত্রাণ ও পুনঃস্থাপনে ব্যয় হচ্ছে। মানবিক সংহতি জানিয়ে বাংলাদেশ সরকারও নেপালকে ১০ লাখ মার্কিন ডলারের জরুরি অনুদান অনুমোদন করেছে।

প্রকৃতির দুর্যোগ, নাকি এটি আর্থিক দুর্যোগও?

একজন ব্যাংকার ও উন্নয়ন গবেষক হিসেবে আমার কাছে দুর্যোগের সবচেয়ে অবহেলিত দিক এর আর্থিক অভিঘাত। যেকোনো দুর্যোগের ক্ষতি অন্তত তিনভাবে দেখা দরকার: প্রত্যক্ষ ক্ষতি (অবকাঠামো ধ্বংস), পরোক্ষ ক্ষতি (বাণিজ্য-উৎপাদন-কর্মসংস্থান ব্যাহত হওয়া), এবং রাজস্ব-ঋণের চাপ (পুনর্গঠনের বাড়তি ঋণ বাজেটের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বোঝা তৈরি করে)।

একটি সেতু ভাঙলে শুধু নির্মাণমূল্য হারায় না—এর ফলে কৃষক বাজারে যেতে পারেন না, শ্রমিক কাজে পৌঁছান না। একটি ক্ষতি এভাবে শৃঙ্খলার মতো বহু কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশ নেপাল নয়, কিন্তু আর্থিক অভিঘাতের জায়গায় মিল অনেক। বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত—সেই প্রশ্নটিই এখন সবচেয়ে জরুরি।

বাংলাদেশের ঝুঁকি: সংখ্যায় বাস্তবতা

বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি—নিচু বদ্বীপভূমি, দীর্ঘ উপকূল ও ঘনবসতির কারণে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে। ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার কারণে কৃষিখাতের জিডিপির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

শুধু তাপপ্রবাহেই ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রায় দেড় থেকে সোয়া দুই বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান। একটি ভয়াবহ বন্যায় দেশের জিডিপি সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলেও বিশ্বব্যাংকের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে।

ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে দেড় বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছিল, ২০০৭ সালের সিডরে ক্ষতি ও লোকসান মিলিয়ে প্রায় ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশ আবাসন ও উৎপাদনশীল খাতে। প্রতিবছর বর্ষায় চট্টগ্রাম বিভাগে পাহাড়ধস মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি ও জীবিকাকে ঝুঁকিতে ফেলে।

উদ্বেগজনক আরেকটি দিক হলো, ঢাকাভিত্তিক থিংক ট্যাংক চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রকাশিত ক্লাইমেট ডেট রিস্ক ইনডেক্স বা জলবায়ু ঋণঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশকে রাখা হয়েছে 'উচ্চ ঝুঁকির ঋণফাঁদ' বিভাগে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ অভিযোজন খাতে মাত্র ১ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার তহবিল পেয়েছে, যা প্রকৃত চাহিদার ১ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ জলবায়ু অভিযোজনের নামে নেওয়া অর্থায়ন যদি অনুদান-নির্ভর না হয়ে ক্রমেই ঋণনির্ভর হতে থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ওপর নতুন চাপ তৈরি করবে।

সরকার অবশ্য জলবায়ু বাজেট বাড়িয়েছে—চলতি অর্থবছরে ২৫টি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়ে সম্মিলিত বাজেটের ১১ শতাংশের বেশি হয়েছে, যা বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও নদীভাঙন মোকাবিলায় ব্যয় হবে। এটি ইতিবাচক, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই ব্যয় কতটা প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতিতে যাচ্ছে, আর কতটা কেবল ক্ষতিপূরণে।

করণীয়: ত্রাণ নয়, আগাম আর্থিক প্রস্তুতি

প্রথমত, একটি জাতীয় ক্ষয়ক্ষতির তথ্যভান্ডার দরকার, যেখানে প্রতিটি বড় দুর্যোগের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ক্ষতি, আয়হানি, কর্মসংস্থান ক্ষতি ও রাজস্ব চাপ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নথিবদ্ধ হবে। আন্তর্জাতিক অর্থায়নের টেবিলে আবেগ নয়, শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হলো বিশ্বাসযোগ্য তথ্য।

দ্বিতীয়ত, প্যারামেট্রিক বিমার মতো ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে, যেখানে নির্দিষ্ট মাত্রার বৃষ্টিপাত, বাতাসের গতি বা পানির উচ্চতা অতিক্রম করলেই পূর্বনির্ধারিত ক্ষতিপূরণ দ্রুত মিলবে। কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য এমন ব্যবস্থা ত্রাণনির্ভরতা কমাতে পারে। আঞ্চলিক পুনর্বিমা ও বিপর্যয় বন্ডের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, ভবিষ্যতের বহিঃঋণ চুক্তিতে জলবায়ু-সহনশীল ঋণধারা বা বড় দুর্যোগের পর সাময়িক ঋণ পরিশোধ ছাড় রাখার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যাতে দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে সীমিত অর্থ ব্যবহার করে অভিযোজনের সুযোগ তৈরি হয়। আর আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া উচিত—জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির অর্থায়ন যতটা সম্ভব অনুদানভিত্তিক হতে হবে, নতুন ঋণের বোঝা দিয়ে নয়।

নরওয়ের সহায়তায় সম্প্রতি বাংলাদেশে জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতি অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে এর সঙ্গে তথ্য, প্রতিষ্ঠান, অর্থায়ন ও কূটনৈতিক কৌশলকে একই কাঠামোয় আনা প্রয়োজন।

কপ-৩১: শুধু চাওয়ার মঞ্চ নয়

আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১, যেখানে ১১ ও ১২ নভেম্বর বিশ্বনেতাদের শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত ১৮ আগস্ট পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় একটি কারিগরি সমন্বয় কমিটি ও তিনটি উপকমিটি—পজিশন পেপার প্রণয়ন, প্যাভিলিয়ন স্থাপন ও সাইড ইভেন্ট আয়োজন, এবং লজিস্টিক সাপোর্ট—গঠন করেছে। সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত দুটি সভায় ইউএনএফসিসিসির আলোচ্যসূচি অনুযায়ী খসড়া পজিশন পেপার প্রস্তুত ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে তা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। সম্মেলনস্থলে নিজস্ব প্যাভিলিয়নে জলবায়ু ঝুঁকি, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি), জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি), জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কার্বন বাজার ও প্রকৃতিনির্ভর সমাধান তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।

লক্ষণীয়, কারিগরি সমন্বয় কমিটি বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে যৌথ অবস্থান নেওয়ার সুযোগও পর্যালোচনা করছে—হিমালয় ও বদ্বীপ অববাহিকার ভাগাভাগি ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে যা তাৎপর্যপূর্ণ। শ্রমিক সংগঠন ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাও দাবি তুলেছে, পজিশন পেপারে শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রতিফলিত হোক, যেহেতু কপ-৩১-কে ইতোমধ্যে ‘বাস্তবায়নের কপ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে এবারের কপ নতুন প্রতিশ্রুতি আদায়ের চেয়ে আগের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দেবে। এটি জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, তবে কূটনৈতিক পরীক্ষাও বটে। নেপালের অভিজ্ঞতা থেকেই স্পষ্ট, দুর্যোগ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক অর্থায়ন আদায়ের পথ কতটা কঠিন এবং প্রতিশ্রুত অর্থের তুলনায় বাস্তব বিতরণ কতটা সীমিত।

তাই বাংলাদেশের উচিত শুধু অভিযোগ বা সাহায্যের আবেদন নিয়ে না গিয়ে বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পের তালিকা নিয়ে যাওয়া—সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পের ছাদে সৌর প্যানেল, সঞ্চালন গ্রিডের আধুনিকায়ন, বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ও সবুজ শিল্পায়নের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব। জলবায়ু-কূটনীতি একই সঙ্গে বিনিয়োগ-কূটনীতিও বটে।

শেষের আগে

নেপালের এই বিপর্যয় আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়—দুর্যোগের প্রথম ছবি মানুষের কান্না, কিন্তু শেষ ছবি অনেক সময় আঁকা হয় একটি দেশের বাজেটের খাতায়। একটি সেতু ভাঙলে হারায় বাজারে যাওয়ার পথ, একটি পরিবার ঘর হারালে নষ্ট হয় বহু বছরের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। তাই দুর্যোগ মোকাবিলা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনারও অংশ।

প্রতিবেশী নেপালের প্রতি সমবেদনার পাশাপাশি থাকা দরকার আত্মবিশ্লেষণ। প্রশ্ন হলো, দুর্যোগ আসার আগেই আমরা কতটা প্রস্তুত, ক্ষতির হিসাব কতটা নিখুঁত, আর কপ-৩১-এর মতো মঞ্চ থেকে ন্যায্য অংশ আদায় করার জন্য আমরা কতটা সংগঠিত। প্রকৃতির শক্তি থামানো যাবে না, কিন্তু তার আর্থিক অভিঘাত অনেকটাই কমানো যায়—যদি প্রস্তুতি শুরু হয় বিপর্যয়ের আগেই, পরে নয়।

  • লেখক: ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত