আপনার চারপাশের মানুষগুলোর তিনজনে একজন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, পিসিওএস বা হরমোনাল ইমব্যালান্সের মতো অসংক্রামক (নন-কমিউনিকেবল) ডিজিজে আক্রান্ত। আমাদের পরিবার, কর্মস্থল ও সমাজে এই সকল রোগের রোগী ও মৃত্যু প্রতিনিয়ত এতটাই দেখি যে, এসব অসংক্রামক রোগ ও এই রোগে মৃত্যু আমাদের কাছে খুবই সাধারণ এবং স্বাভাবিক ঘটনা মনে হয়। অথচ এসব রোগের কারণ জানলে আপনিও খুব সহজেই নিজের ভুলগুলো বুঝবেন এবং আগামীর মহামারি থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করতে পারবেন।
অসংক্রামক শব্দ থেকেই ধারণা পাওয়া যায়, এই রোগগুলো একজন থেকে অন্যজনের মাঝে ছড়ায় না, অর্থাৎ এর মূল কারণ ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস নয়, বরং রোগের মূলে রয়েছে আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাস। অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, বারবার খাওয়া, পরিশ্রম না করা, নিয়ম মেনে না ঘুমানো এবং মানসিক অশান্তি বা স্ট্রেস—জীবনযাপনের এই ভুল অভ্যাসগুলোর ফলে রোগগুলো শরীরে জন্ম নেয়। ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ সিস্টেম, একটা রোগ থেকে জন্ম হয় আরেকটা রোগ—ওষুধে রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় দেখা দেয় ভিন্ন রোগ। ধীরে ধীরে শরীর কর্মক্ষমতা হারায়, অঙ্গগুলো নষ্ট হয়—সবশেষে চূড়ান্ত পরিণতি মৃত্যু দেখা দেয়; অথচ আমাদের কাছে এই সবকিছু খুবই স্বাভাবিক।
ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের (আইএইচএমই) গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ ২০২৩ সমীক্ষা এমনই তথ্য তুলে ধরেছে, বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের জন্য দায়ী ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক মতো অসংক্রামক ব্যাধি বা এনসিডি। আইএইচএমই-এর এই রিপোর্টে দেখা যায়, বাংলাদেশেও এনসিডির পরিস্থিতি একইরকম। দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৬৭%-এর কারণ অসংক্রামক ব্যাধি। আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় এসেছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিল প্রায় ৭১ লাখ মানুষ। এছাড়াও, ডায়াবেটিস আছে কিন্তু রোগ নির্ণয় করতে আসেননি এমন মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৭ লাখ। ওই বছর কেবল ডায়াবেটিসজনিত রোগে প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ডায়াবেটিস ছাড়াও উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, স্থূলতা, ফ্যাটি লিভার, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ, পিসিওএস, অস্টিওপোরোসিস, অস্টিওআর্থ্রাইটিস ও আলঝেইমার্সের মতো রোগগুলোর চিত্রও ভয়াবহ।
বেশিরভাগ সময় কোনো লক্ষণ প্রকাশ করা ছাড়াই এই রোগগুলো নিঃশব্দে শরীরের অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গগুলোর ক্ষতি করে। পরবর্তীতে এগুলো হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, কিডনি বিকল করে ফেলা, দৃষ্টিশক্তি হারানো ও স্নায়বিক (নার্ভ-সম্পর্কিত) ক্ষতির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অসংক্রামক ব্যাধির অন্যতম প্রধান কারণ ইনসুলিন রেজিজট্যান্স। ইনসুলিন মূলত একটি হরমোন যা রক্ত থেকে গ্লুকোজ কোষে পৌঁছে দিয়ে তা শক্তিতে রূপান্তরিত করে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার গ্রহণ করলে, এবং পরিশ্রম না করলে রক্তে সবসময় অতিমাত্রায় সুগার ও ইনসুলিন বিধ্যমান থাকে ফলে ধীরে ধীরে আমাদের শরীরের কোষগুলো হয়ে যায় ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। এখান থেকেই মূলত সুত্রপাত হয় ৭০ থেকে ৮০ টার ও বেশি লাইফস্টাইল ডিজিজ।
ইনসুলিন রেজিজট্যান্স হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাওয়া, বিশেষ করে, প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার বেশি খাওয়া, প্রয়োজনের অতিরিক্ত চিনি বা মিষ্টি খাওয়া, কায়িক পরিশ্রমে অলসতা করা, অপর্যাপ্ত ঘুম ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এর মধ্যে অন্যতম।
তবে, আশার কথা হচ্ছে, সঠিক দিকনির্দেশনা ও ধারাবাহিক অনুশীলনের মাধ্যমে ইনসুলিন রেজিজট্যান্স নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। এর জন্য মিষ্টি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া কমিয়ে প্রাকৃতিক ও সুষম খাবারের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। অটোফেজির মাধ্যমেও ইনসুলিন রেজিজট্যান্স নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। খাবারের মাঝখানে দীর্ঘসময় বিরতি দিলে কোষগুলো বিশ্রাম করার ও ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলো ভেঙে পুনর্গঠিত হওয়ার সুযোগ পায়।
নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম করার মাধ্যমে শরীরে ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ে। প্রতিদিন অন্তত আধাঘণ্টা ব্যায়াম বা হাঁটার মাধ্যমে শারীরিক জটিলতা অনেকখানি কমিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে। নিয়ম মেনে পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কারণ ঘুমের সময় শরীরবৃত্তীয় কর্মকাণ্ড কমে আসে, ফলে, শরীর প্রাকৃতিকভাবে নিজের ক্ষয়পূরণ ও নিরাময়ের সুযোগ পায়। এছাড়াও যোগব্যায়াম, ধ্যান ও ইতিবাচক ভাবনার মাধ্যমে স্ট্রেস হরমোন কমিয়ে এনে নার্ভাস সিস্টেমকে শান্ত রাখাও মানসিক প্রশান্তির অন্যতম উপায়।
এ ব্যাপারে জেকে লাইফস্টাইলের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, 'অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি কমাতে ও সুস্থ জীবনযাপন নিশ্চিত করতে প্রতিদিনের অভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা জরুরি। বিশেষ করে, ইনসুলিন রেজিজট্যান্স নিয়ন্ত্রণে সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক প্রশান্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সুস্থতা কোনো এককালীন প্রচেষ্টার বিষয় নয় বরং, ধারাবাহিক অনুশীলন ও সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গড়ে তোলা সম্ভব।'
দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন একদিনে আসে না বরং, প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে। এই পরিবর্তন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী চলার মাধ্যমে আরও কার্যকরী হয়। এক্ষেত্রে যেমন জেকে লাইফস্টাইল উল্লেখযোগ্য। খাদ্য, ঘুম, কায়িক পরিশ্রম ও মানসিক প্রশান্তির সমন্বয়ে একটি টেকসই রুটিন গঠনে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। রোগাক্রান্ত হয়ে ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার চেয়ে সচেতন জীবনযাপনের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করা বহুগুণে শ্রেয়। একটি সুস্থ আগামীর জন্য তাই সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।