সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

তৃষ্ণা মেটাতে বরফযুক্ত পানি কতটা স্বাস্থ্যকর?

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৭:২১ পিএম

তাপদাহের এ সময়ে রাস্তায় বেরুলেই ঘামে শরীর ভিজে যাচ্ছে। ঘনঘন পাচ্ছে পানির তৃষ্ণা। তাই তৃষ্ণা মেটাতে অনেককেই রাস্তার পাশে বরফযুক্ত পানীয় পান করতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা শহরের নিম্নআয়ের মানুষরা রাস্তার পাশের এসব পানীয় বেশি পান করছেন। তাদের অনেকে হয়তো এসবের ক্ষতিকর দিকটা জানেন, আর অনেকে হয়তো জানেন না।

অথচ রাস্তার পাশে খোলামেলা জায়গায় বানানো এসব পানীয় শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এমনটাই জানিয়েছেন দুই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তাদের দাবি, ‘রাস্তার পাশের এসব পানীয় পান করলে পানিবাহিত অনেক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এমনকি দীর্ঘমেয়াদি অনেক রোগও হতে পারে।’ 

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গরমের তীব্রতা বাড়লেই ভ্যানগাড়িতে করে শুরু হয় জুস কিংবা ঠাণ্ডা পানীয় বিক্রির প্রতিযোগিতা। একটি পানির ফিল্টারের মধ্যে বরফ, লেবু ও ‘ড্রিংক পাউডার’ নিয়েই চলে এই পানীয় তৈরির প্রক্রিয়া। রাস্তার পাশে এসব পানীয়র মধ্যে লেবু আর ড্রিংক পাউডারে তৈরি পানীয় বেশ জনপ্রিয়। শুধু লেবুর পানি এক গ্লাস ১০ টাকা এবং এই ড্রিংক পাউডার মেশানোর লেবুর পানি প্রতি গ্লাস ২০ টাকায়  বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও ভ্যানগাড়িতে বিক্রি হচ্ছে আখের রস। আর এসব ভ্যান গাড়িতে গ্লাস থাকে ৩-৪টি। একজনের খাওয়া শেষ হলে সেই গ্লাস সাধারণ পানি দিয়ে ধোয়ার পর সেই গ্লাসে আবারও পরিবেশন করা হচ্ছে আরেকজনকে। আবার লেবুর রস যেই যন্ত্র দিয়ে চিপে বের করা হচ্ছে, তাতেও ময়লা জমে থাকতে দেখা গেছে।

ছবি: ফোকাস বাংলা  

রাজধানীর ব্যস্ততম বাংলামোটর, ফার্মগেট, শাহবাগ, নিউ মার্কেট ও নীলক্ষেত ঘুরে দেখা গেছে, বিশেষ করে রিকশাচালক, শিক্ষার্থী ও পথচারীরা সবথেকে বেশি বরফযুক্ত আখের রস ও লেবুর শরবত পান করছেন। এক গ্লাস আখের রস ২০ টাকা আর লেবুর শরবত ১০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। দাম কম হওয়ায় মানুষ এই দুই পানীয় বেশি পান করছেন। অথচ শরবত বানাতে যে বরফ ব্যবহার করা হচ্ছে তা কতটা স্বাস্থ্যকর?

রাজধানীর ফার্মগেটে আখের রস বিক্রি করছেন মো. আরাফাত। তার ফুটপাতের দোকান ঘিরে রিকশাচালকদের ভিড় জমেছে। তিনি আখ মাড়িয়ে রস বানাচ্ছেন, আর তার সহযোগী সেগুলো মানুষকে দিচ্ছেন। অথচ রাস্তার ধূলোবালি গিয়ে পড়ছে ওই আখের রসে। এছাড়াও মাছি তো আছেই। তবুও শ্রমজীবী মানুষ তৃষ্ণা মেটাতে তা পান করছেন। 

শরবত বানানোর বিশেষ উপাদান বরফ কোথায় থেকে কিনেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মামা এগুলো ভালো বরফ। খেলে কিছুই হবে না। মাছের বরফ কিনা এমন প্রশ্ন করতেই তিনি রেগে যান। তবে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বলে উঠলেন এসব মাছের বরফ।’

বাংলামোটর মোড়ে দাঁড়িয়ে শরবত জন্য অপেক্ষা করছে কয়েকজন। ছবি: দেশ রূপান্তর

এ সময় ওই শরবতের দোকানে কথা হয় রিকশা চালক রহিম মিয়ার সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, যে গরম পড়েছে তাতে ভাড়া মারা খুবই কষ্টকর। একটা ভাড়া শেষ করেই বিশ্রাম নিতে হয়। আর ঘনঘন তৃষ্ণা লাগে। তাই এই ঠান্ডা আখের রস খেলে একটু ভালো লাগে।’ এসব পানীয় স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ক্ষতিকর এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমরা পরিশ্রম করি তাই কিছুই হবে না। আমাদের ঘামের সঙ্গে এসব বেরিয়ে যায়।

এসব বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আসাদুল কবিরের সঙ্গে কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাস্তার পাশে বরফযুক্ত ঠান্ডা পানি শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কারণ যে পরিবেশে শরবত বানানো হয় তাতে ব্যকটেরিয়া থাকাটাই স্বাভাবিক। আর ভাইরাসের চেয়ে ব্যকটেরিয়া ইনফেকশন বেশি ছড়ায়। এর কারণে ডায়রিয়া, জন্ডিসসহ অনেক রোগ হয়। সব বয়সী মানুষের জন্য চলমান তাপদাহে যে কোন ধরনের ঠান্ডা পানি না খাওয়াই ভালো। ভালো হয় স্বাভাবিক পানি পান করা, এটা শরীরের জন্য উত্তম। মূল বিষয় হল শরীরের পানিশূণ্যতা দূর হওয়াটাই মূল বিষয়। 

মাছের বরফ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, মাছের বরফ যে কোন পানি দিয়েই তৈরি করা যায়। ফলে শরবতে যে বরফ ব্যবহার করা হয় তা নিয়ে প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। যারা এসব কিনে আনেন তারা এর ক্ষতিকর বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না। জানলেও ব্যবসায়িক স্বার্থে হয়তো এড়িয়ে যান। তাই নিজেকেই সতর্ক থাকতে হবে।’ 

গতকাল শনিবার ঢাকার নীলক্ষেত এলাকায় বই কিনতে যান আদনান নামের এক শিক্ষার্থী। দীর্ঘ সময় ধরে ঘুরে ঘুরে পছন্দের বই কিনে ক্লান্ত হয়ে যান রাস্তার পাশের শরবতের দোকানে। এ সময় কথা হয় তার সঙ্গে। বরফযুক্ত এসব পানীয় শরীরের জন্য ক্ষতিকর জেনেও কেন পান করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, জানি এসবে ধূলোবালি ও মাছি পড়ছে। তবুও মন চাচ্ছে ঠান্ডা পানি পান করি। তাই লেবুর শরবত খাচ্ছি। তবে এসব বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত।’

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গরমে এমনিতেই শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হয়। তাই অনেকেই এখন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন পানীয় পান করছেন। আবার অনেকে রংমিশ্রিত বিভিন্ন পানীয় পান করেন। এটা শরীরের জন্য অনেক ক্ষতিকর। 

কারণ শরবত তৈরিতে যে রংগুলো ব্যবহার করা হয় সেগুলো মানসম্মত নয়। কারণ খাবারে যে রংগুলো ব্যবহার করা তার দাম অনেক। আর ওই রংগুলো এত গাঢ় হয়না। স্বাভাবিকভাবেই রাস্তার পাশে দোকানিরা কম দামের রংগুলো কিনে থাকেন। আর রংযুক্ত এসব পানীয় শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘রাস্তার পাশের এই ভ্রাম্যমান দোকানগুলো বন্ধ করা সমাধান নয়। বরং মানুষদের সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে সাধারণ আয়ের মানুষদের মাঝে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ব্যবসায়িক স্বার্থে অনেকে মাছের বরফ ব্যবহার করছেন যা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। মূলত সামাজিক সচেতনতাই পারে এসব সমস্যা থেকে উত্তোরণ ঘটাতে। এজন্য শিক্ষিত তরুণ যুব সমাজকে কাজে লাগাতে হবে।’

 

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত