ছোটদের খেলার মাঠ কিংবা জীবনের যেকোনো পথচলা সেখানে আনন্দের চেয়ে যদি ফলাফলের চাপ বেশি হয়ে দাঁড়ায়, তবে সন্তানের ভালো করার বদলে উল্টো ক্ষতিই হয়। উদীয়মান ফুটবলারদের অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে ঠিক এই আকুল বার্তাটিই দিলেন আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মিয়ামির কিংবদন্তি অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
শুক্রবার স্পেনের মর্যাদাপূর্ণ ‘প্রিন্সেস দে অ্যাস্তুরিয়াস’ পুরস্কার গ্রহণ করেছেন ৮ বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই তারকা। এর আগে বৃহস্পতিবার ওভিয়েদোর ‘পালাসিও দে লোস দেপোর্তেস’-এ স্থানীয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক ভাবগম্ভীর অথচ প্রাণবন্ত মতবিনিময় সভায় যোগ দেন তিনি। সেখানে হাজারো খুদে ভক্তের উষ্ণ অভ্যর্থনায় সিক্ত হয়ে নিজের জীবনের নানা চড়াই-উতরাই ও খেলার পেছনের মূল দর্শনের কথা তুলে ধরেন মেসি।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে খুদে খেলোয়াড়দের স্বাভাবিক বিকাশে অভিভাবকদের ভূমিকার বিষয়টি উঠে এলে মেসি বলেন, ‘অনেক বাচ্চার অভিভাবকই তাদের কাছ থেকে অনেক বেশি কিছু প্রত্যাশা করেন এবং তাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেন। তারা হয়তো বুঝতেও পারেন না যে, সাহায্য করার বদলে অতিরিক্ত চাপ ও চাহিদা চাপিয়ে দিয়ে তারা নিজেদের সন্তানদের আসলে ক্ষতিই করছেন।’ নিজের শৈশবের ফুটবলে হাতেখড়ি থেকে শুরু করে বিশ্ব ফুটবলের রাজপুত্র হয়ে ওঠার পেছনে ‘উপভোগ করা’র মানসিকতাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে জানান মেসি। তিনি যোগ করেন, ‘আমরা যখন ছোট থাকি, কিংবা সাধারণ জীবনেও নিজের কাজটি উপভোগ করা সবচেয়ে জরুরি। মানুষ যখন নিজের পছন্দের কাজটি আনন্দের সঙ্গে করে, তখন সে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নিজের সেরাটা দিতে পারে এবং সবকিছু খুব স্বাভাবিকভাবেই ঘটে।’
আলোচনায় উঠে আসে ২০০৩ সালে বার্সেলোনার মূল দলে তার সেই স্বপ্নের অভিষেকের গল্পও। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তৎকালীন সময়ের বিশ্বসেরা তারকা রোনালদিনহো, সামুয়েল ইতো, জাভি হার্নান্দেজ ও কার্লেস পুয়োলদের সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগ করার মুহূর্তটি কতটা কঠিন ছিল, তাও গোপন করেননি তিনি। মেসির ভাষায়, ‘আমার জন্য সময়টা খুব কঠিন ছিল। আমি জন্মগতভাবেই কিছুটা লাজুক স্বভাবের, তাই এত বড় বড় তারকাদের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলাম না।’
তবে সেই দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে ওঠার জন্য সিনিয়রদের দেওয়া একটি পরামর্শই তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল বলে জানান তিনি। ‘আমাকে বলা হয়েছিল সবকিছু ভুলে যেতে, খেলাটি উপভোগ করতে এবং ছোটবেলা থেকে আমি যা করে এসেছি ঠিক তা-ই করে যেতে। পাশে কে খেলছে তা না ভেবে নিজের পছন্দের খেলাটি নিজের মতো খেলে যেতে বলা হয়েছিল’ স্মৃতিচারণ করেন এই ফুটবলের জাদুকর।
ক্যারিয়ারে অজস্র সাফল্যের পাশাপাশি আর্জেন্টিনা দল ও বার্সেলোনার হয়ে একাধিক ফাইনাল হার এবং সে কারণে তীব্র সমালোচনার ঝড় সামলানোর অভিজ্ঞতাও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শেয়ার করেন মেসি। পরাজয়কে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ফাইনালে ওঠা সহজ কথা নয়। ফাইনালে দুটি দল খেলে এবং শেষ পর্যন্ত জেতে একটি দলই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করা এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়া। নিজের শতভাগ দেওয়ার পর ফল যা-ই হোক, তাতেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত।’
অভিভাবক ও খুদে ফুটবলারদের পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা গড়ার আহ্বান জানিয়ে মেসি শেষ করেন, ‘হেরে যাওয়া অভ্যাসে পরিণত করা যাবে না ঠিকই, তবে খেলায় হারও আসতে পারেÑ সেটি মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে এবং তা থেকে ইতিবাচক শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।’