কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম হত্যা মামলায় দুই কিশোরসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধারের ৩১ দিনের মাথায় গত ২০ অক্টোবর এ অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এদিকে তদন্ত শেষ হলেও পরিবারের উদ্বেগ কাটেনি। অভিযোগপত্রে দুই কিশোরের বয়স উল্লেখ করা হলেও তা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন রয়েছে স্বজনদের। অভিযোগপত্রের অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে পরিবার। তাদের চাওয়া, দ্রুত বিচার শেষে হত্যাকা-ে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
গতকাল শুক্রবার সকালে অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান। তিনি বলেন, ২০ অক্টোবর দুই কিশোরসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। মামলার বাদী ও অপ্রতিমের বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়ে জানতে তিন দিন আগে তদন্ত কর্মকর্তাকে ফোন করেছিলেন তিনি। তখন পূজার ছুটি শেষ হওয়ার পরপরই অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে তদন্ত কর্মকর্তা ফোন করে অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টি তাকে জানান। আমরা খুনিদের দ্রুত বিচার দেখতে চাই। আশা করি, দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করে খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
চারজনের বিরুদ্ধে তিন ধারায় অভিযোগ : মামলাটির দ্বিতীয় তদন্ত কর্মকর্তা কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাজীব আহমেদ। অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯), মো. সিয়াম (১৯) এবং ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোরকে। তাদের বিরুদ্ধে দ-বিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। শিশু আইন অনুযায়ী, দুই কিশোরকে শিশু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান অভিযুক্ত তুহিন। অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনায় সিয়ামও যুক্ত ছিলেন। তিনজনের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যাকা-ে অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সিয়ামের বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনা ও সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশ আরও জানায়, তুহিন এবং ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে অভিযোগপত্রে দুই কিশোরের বয়স নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অপ্রতিমের পরিবারের। তাদের প্রকৃত বয়স যাচাইয়ে প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষার দাবি জানিয়েছিল পরিবার। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। অভিযোগপত্রের অনুলিপি পাওয়ার পর এ বিষয়ে আইনজীবীর পরামর্শে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে পরিবার।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, পুলিশ সুপারের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। মরদেহ উদ্ধারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে ৩১ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।
দুর্গাপূজার ছুটির কারণে অভিযোগপত্র দাখিলের পরপরই আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হয়নি। পুলিশ সূত্র জানায়, ছুটি শেষে আগামীকাল রবিবার থেকে আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। উল্লেখ্য, গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা নগরের কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। সে বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পর দিন ১৯ সেপ্টেম্বর সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে পরিকল্পিতভাবে নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়। এতে তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তদন্তে সিয়ামের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার বাসার খাটের তোশকের নিচ থেকে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজের পর বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে তুহিনকে শনাক্ত করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকা-ে অন্যদের সম্পৃক্ততার তথ্য পায় পুলিশ।