অবৈধ হর্নে সর্বনাশ

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪০ এএম

রাজধানীর আফতাবনগরের বাসিন্দা নওশাদ বেগম তার আড়াই বছর বয়সী শিশু মাইসাকে নিয়ে আইডিয়াল স্কুল বনশ্রী শাখার সামনে অপেক্ষা করছিলেন। সেখানে তার ছেলে অনিক ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। এমন সময় আলিফ পরিবহনের একটি বাস সজোরে হর্ন বাজাতে বাজাতে পাশেই স্টপেজে থামে। পেছনে আসা একই পরিবহনের অপর একটি বাস আরও জোরে হর্ন বাজিয়ে সামনে থাকা বাসটিকে ওভারটেক চায়। সড়কে ডিভাইডার থাকায় স্থানটিতে একটি বাস দাঁড়ালে অপর বাস অতিক্রম করার জায়গা নেই। তাই তারা হর্ন বাজিয়েই চলে। হর্নের বিকট শব্দে বারবার কেঁপে ওঠে ছোট্ট শিশু মাইসা। টের পেয়ে মা তার সন্তানের দুই কান হাতে চেপে ধরে একটু দূরে সরে যান। এদিকে আরও কয়েকটা প্রাইভেট কার, অটো, মোটরবাইক এবং একটা অ্যাম্বুলেন্সও ওই যানজটে আটকা পড়ে। এ সময় প্রত্যেক গাড়ির হর্নে এক ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শিশু মাইসা আতঙ্কে কেঁদে ওঠে। গত ১৫ অক্টোবর নওশাদ বেগম দেশ রূপান্তরকে এই ঘটনাটি জানিয়ে বলেন, ‘সময়টা ছিল আগস্টের মাঝামাঝি এক দুপুর। এরপর থেকে আমার বেবির ট্রমা কাটেনি। কোনো গাড়ির সামনে তো দূরে থাক; সড়কেও যেতে চায় না সে।’

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা বলছে, এমন অতিমাত্রার শব্দযন্ত্রণা শিশুর ঘুম, শ্রবণ, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিজনিত মস্তিষ্কের কার্যক্রমে দীর্ঘস্থায়ী মারাত্মক ক্ষতি করে। এ ছাড়া হঠাৎ শব্দদূষণ মানবদেহের আদ্রেনালাইন ও কর্টিসলের মতো হরমোনকে প্রভাবিত করে অস্বাভাবিক হার্টবিট সৃষ্টিসহ উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। প্রতি বছর অতিমাত্রার আকস্মিক শব্দদূষণ দীর্ঘমেয়াদে লাখ লাখ মানুষকে অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ইউএন পরিবেশ কর্মসূচি (ইউনেপ) ২০২২ সালে ঢাকাকে বিশ্বের শীর্ষ শব্দদূষণ সৃষ্টিকারী নগরগুলোর র‌্যাংকিংয়ে এক নম্বরে স্থান দিয়েছে। সংস্থাটির পরবর্তী কোনো গবেষণায়ও ঢাকার অবস্থান পরিবর্তিত হয়নি। ওই প্রতিবেদনে ইউনেপ জানায়, ঢাকায় গণপরিবহনে সৃষ্ট শব্দদূষণের তীব্রতা ১১৯ ডেসিবল; যা অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। শব্দদূষণের মাত্রা ১১৪ ডেসিবল নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতের মুরাদাবাদ। তৃতীয় অবস্থানে পাকিস্তানের ইসলামাবাদ, দূষণমাত্রা ১০৫ ডেসিবল। ইউরোপীয় জার্নাল জানায়, বিশ্বে অনুমোদিত শব্দদূষণের মাত্রা ৫৫ ডেসিবল, যা মানবদেহের জন্য সহনীয়।

ওই দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থা নিজস্ব প্রতিবেদনে বাংলাদেশে মোটরযানে উচ্চমাত্রার হর্ন ব্যবহারের কারণে জনস্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

ঢাকার শব্দদূষণে গণপরিবহনে ব্যবহৃত হর্নের দায় নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, অননুমোদিত হর্ন ব্যবহার বন্ধে ঢাকা মহানগর পুলিশের নিয়মিত অভিযান চলমান আছে। কিন্তু এই অতিমাত্রার হর্ন ব্যবহার এক ধরনের অভ্যাস বা প্রবণতা। হঠাৎ অভিযান করে, জরিমানা করে আসলে কাজ হয় না। আমাদের দরকার উন্নত প্রযুক্তি।

তিনি বলেন, চীনের সাংহাইসহ একাধিক নগরীতে অবৈধ হর্ন রোধে ’অ্যাকোয়াস্টিক ট্র্যাকিং ডিভাইস’ ব্যবহার করা হয়। আমাদের এখানে ওই ডিভাইস ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওই ডিভাইস উচ্চপ্রযুক্তির মাধ্যমে অতিমাত্রার হর্ন ব্যবহারকারী পরিবহন নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে ও কন্ট্রোল রুমে সিগনাল পাঠায়। এতে ট্রাফিক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট পরিবহনটিকে সহজে পাকড়াও করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থা নিয়মিত ধারাবাহিকভাবে নিতে পারলে পরিবহন মালিক ও ব্যবহারকারীরা সতর্ক হবে।

আনিসুর রহমান আরও জানান, ‘অ্যাকোয়াস্টিক ট্র্যাকিং ডিভাইস’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আশা করছি, শিগগিরই বরাদ্দ পেয়ে যাব। সব মিলিয়ে মাস দুয়েক লাগতে পারে। প্রথমে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক পয়েন্টে এর পাইলটিং করা হবে। এরপর অভিজ্ঞতা নিয়ে আরও ব্যাপক আকারে এই ডিভাইস ব্যবহার করা হবে।

অননুমোদিত হর্নের আমদানি ও বেচাকেনা মনিটরিং নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি পুলিশ একা পারবে না। জনবল সংকট নিয়ে প্রচুর রুটিন ওয়ার্ক করতে হয়। এ ব্যাপারে বিআরটিএ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তা নিয়ে কাজ করতে পারে। সবাইকে আন্তরিক হতে হবে।

২০২৪ সালের ১৬ মে বিআরটিএ মোটরযানে হুটার, হাইড্রোলিক হর্ন ও অন্যান্য অননুমোদিত হর্ন ব্যবহার না করতে প্রজ্ঞাপন জারি করে। সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি-৮১ অনুযায়ী অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনির্বাপক বা উদ্ধারকাজের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত মোটরযান অথবা রাষ্ট্রীয় জরুরি কাজে ব্যবহৃত মোটরযান ছাড়া অন্য যেকোনো মোটরযানে পরপর বিভিন্ন সুর প্রদানকারী বহুমুখী হর্ন অথবা তীব্র, কর্কশ, আকস্মিক, বিকট বা ভীতিকর শব্দের হর্ন বা যন্ত্র সংযোজন বা ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, অননুমোদিত হর্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি করা ছাড়াও চালকগণকে বেপরোয়া ও দ্রুতগতিতে মোটরযান চালাতে উৎসাহিত করে, এর ফলে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। লক্ষ করা যাচ্ছে যে, কিছু কিছু মোটরযানে হুটার, হাইড্রোলিক হর্ন ও অন্যান্য অননুমোদিত হর্ন সংযোজন করে ব্যবহার করার ফলে গণ-উপদ্রবের সৃষ্টি হচ্ছে, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

একাধিক বাস ও ট্রাকচালকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অননুমোদিত উচ্চমাত্রার হর্ন বিক্রি হয় ধোলাইখাল এলাকায়। বাস ও ট্রাকে ইঞ্জিন কিংবা বডির গোপন স্থানে ওইসব হর্ন বসানো হয়, যাতে সহজে ট্রাফিকের নজরে না আসে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধরা পড়লেও সামান্য অর্থের বিনিময়ে চেকপোস্টের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সামলে নেওয়া হয়। এসব হর্নের দাম কম, সহজলভ্য।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ছাড়াও প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল এমনকি ব্যাটারিচালিত অটোতেও অননুমোদিত হর্ন ব্যবহার হচ্ছে।

সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী কোনো চালক বা মালিক যদি যানবাহনে নিষিদ্ধ হাইড্রোলিক হর্ন বা অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি শব্দ সৃষ্টিকারী ডিভাইস ব্যবহার করেন, তবে সরাসরি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও অপরাধের মাত্রাভেদে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। এ ছাড়া, চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে একটি দোষসূচক পয়েন্ট কেটে নেওয়া হবে। (উল্লেখ্য, লাইসেন্সের মোট ১০ পয়েন্ট শেষ হলে চালকের লাইসেন্স বাতিল হয়ে যায়)। অননুমোদিত হর্ন আমদানি, মজুদ, প্রদর্শন বা বিক্রি করলে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা জরিমানা বা এক মাসের কারাদণ্ডের নিয়ম রয়েছে।

এদিকে, অবৈধ ও উচ্চমাত্রার হর্ন ব্যবহার রোধে গাজীপুর জেলা প্রশাসন ‘নো হর্ন ক্যাম্পেইন’ নামে এক ভিন্নধর্মী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নুরুল করিম ভুঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৬ সপ্তাহের ওই কর্মসূচির নবম সপ্তাহ চলছে। শুরুতে আমার নিজের ব্যবহৃত গাড়িতেও হর্ন ব্যবহার সীমিত করেছি। ইতিমধ্যে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বসেছি। অননুমোদিত হর্ন রিমুভ (অপসারণ) করতে বাস মালিকদের বেঁধে দেওয়া ১৫ দিন শেষ হতে চলেছে। এরপর পর্যায়ক্রমে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, সিএনজি এবং অটোচালকদের সঙ্গে বসব।

জেলা প্রশাসক বলেন, এই কর্মসূচির বিশেষ বৈশিষ্ট হলো মোটিভেশনের মাধ্যমে বিধি মেনে হর্ন ব্যবহারে সংশ্লিষ্টদের উদ্বুদ্ধ করা। ১৫তম সপ্তাহে মোটরযান চালকদের মধ্যে যারা বিধিনিষেধ মানবে না তাদের আটক করে একটি ‘ক্যাম্পে’ আনা হবে। সেখানে তাদের ৪০ মিনিটের ভিডিও দেখিয়ে অবৈধ ও অতিমাত্রার হর্ন ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হবে। যারা ওই ভিডিও দেখে নিজেকে শোধরানোর অঙ্গীকার করবে তাদের দেওয়া হবে একটি ক্যাপ এবং ‘আমি হর্ন বাজাই না’ লেখা একটি টি-শার্ট।    

গত ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানী ঢাকায় যানবাহনের হর্নের অতিরিক্ত ব্যবহার কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও কঠোর ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মতো হর্ন নিয়ন্ত্রণেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করা, সড়ক থেকে ফিটনেসবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ এবং পরিবেশ দূষণকারী বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন দ্রুত অপসারণ এবং রাজধানীতে আরও অন্তত ৫০টি পয়েন্টে অটোমেটিক ট্রাফিক লাইট সিস্টেম দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালু করতে নির্দেশ দেন তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত