সন্ধ্যা নামতেই চট্টগ্রামের এভারকেয়ার হাসপাতালের চিরচেনা রূপ বদলে যায়। পুরো ভবনটি স্নিগ্ধ গোলাপি রঙের আলোয় সেজে ওঠে। এভারকেয়ারের বিশেষ আলোকসজ্জা; যা কেবল সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে না, বরং স্তন ক্যানসার মোকাবিলায় নারীদের সচেতন হওয়ার এক অনন্য বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে মানুষের কাছে।
আন্তর্জাতিক স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস বা ‘পিংক অক্টোবর’ উপলক্ষে এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রামে গ্রহণ করা হয়েছে এই ‘লাইট আপ পিংক’ ব্যতিক্রমী কর্মসূচি। চিকিৎসকরা বলছেন, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণই পারে স্তন ক্যানসার জয় করতে। লজ্জা, অসচেতনতা কিংবা অবহেলার কারণে অনেক নারীই প্রাথমিক লক্ষণগুলো এড়িয়ে যান। নারীর এই জড়তা কাটাতে এবং স্বাস্থ্যের প্রতি যতœবান হওয়ার তাগিদ দিতেই এভারকেয়ার হাসপাতালের মাসজুড়ে নানা ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
বিনামূল্যে ব্রেস্ট হেলথ চেকআপ
সপ্তাহজুড়ে প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত এভারকেয়ার হাসপাতালে চলছে বিনামূল্যে ব্রেস্ট হেলথ চেকআপ ক্যাম্পেইন। এ সময়ে ০৯৬১০৮০০৪৪৪ নম্বরে কল করে নিবন্ধন করে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে যেকোনো বয়সী নারী স্তন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নিতে পারবেন।
বহুমাত্রিক বিশেষজ্ঞ সেবা
স্তনের যেকোনো সমস্যার সমন্বিত ও বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালটিতে নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে ‘এভারকেয়ার ব্রেস্ট ক্লিনিক’। এই ক্লিনিকে সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মো. সুরমান আলী, মেডিকেল অ্যান্ড রেডিয়েশন অনকোলজির কনসালট্যান্ট ডা. হাসনিনা আক্তার ও অ্যাটেন্ডিং কনসালট্যান্ট ডা. নয়ন ভৌমিক এবং রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আয়েশা পারভীন ও কনসালট্যান্ট ডা. রেহনুমা রশীদ চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। এই বহুমাত্রিক টিমের কারণে একজন রোগী ক্লিনিকে আসার পর তার শারীরিক অবস্থা ও রোগ অনুযায়ী নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ডায়াগনসিস থেকে শুরু করে সার্জারি বা রেডিয়েশন; স্তনসংক্রান্ত যেকোনো জটিলতার বিশ্বমানের সেবা মিলছে এক ছাদের নিচে। পাশাপাশি ম্যামোগ্রাফি ও আলট্রাসাউন্ডের জন্য রয়েছে বিশেষ প্যাকেজ সুবিধা।
হাসপাতালটির মেডিকেল অ্যান্ড রেডিয়েশন অনকোলজির ভিজিটিং সিনিয়র কনসালট্যান্ট প্রফেসর ডা. সাজ্জাদ মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, স্তন ক্যানসার একক ধরনের রোগ নয়। ক্যানসারের পর্যায়, কোষের বৈশিষ্ট্য, হরমোন রিসেপ্টরের অবস্থা, এইচইআর-২ এর মতো নির্দিষ্ট জৈবিক নির্দেশক এবং রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য বিবেচনা করে চিকিৎসার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। তাই অন্য কোনো রোগীর চিকিৎসা দেখে নিজের চিকিৎসা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। অক্টোবর স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাসে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত রোগ সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরি করা, ভয় ও ভুল ধারণা দূর করা এবং রোগীকে চিকিৎসার সিদ্ধান্তে সচেতনভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
ব্রেস্ট কনজারভিং সার্জারি
এ প্রসঙ্গে সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মো. সুরমান আলী বলেন, সব স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে পুরো স্তন অপসারণের প্রয়োজন হয় না। উপযুক্ত রোগীদের জন্য ব্রেস্ট কনজারভিং সার্জারি বা স্তন সংরক্ষণমূলক অস্ত্রোপচার গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি। যেখানে ক্যানসার আক্রান্ত অংশ এবং তার চারপাশের প্রয়োজনীয় কিছু সুস্থ টিস্যু অপসারণ করা হয়, কিন্তু স্তনের বাকি অংশ সংরক্ষণ করা হয়। একে অনেক সময় লাম্পেকটমি বা ব্রেস্ট কনজারভিং সার্জারি বলা হয়।
সামাজিক মাধ্যমে প্রচার
এভারকেয়ারের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে নিয়মিত সচেতনতামূলক পোস্ট, চিকিৎসকদের বিশেষ পরামর্শ-সংবলিত ভিডিও বার্তা এবং তথ্যবহুল কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ঘরে বসেই সাধারণ মানুষ ক্যানসারের লক্ষণ ও করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারছেন।
ক্যানসারজয়ীদের পেশেন্ট ফোরাম
মাসব্যাপী এই আয়োজনের অন্যতম প্রাণবন্ত অংশ হলো স্তন ক্যানসারজয়ী নারীদের নিয়ে বিশেষ পেশেন্ট ফোরাম ও মিডিয়া ইভেন্ট। এখানে ক্যানসারজয়ী নারীদের নিয়ে আড্ডার পাশাপাশি সচেতনতা সৃষ্টিতে বিশেষ সেশন পরিচালনা করা হবে। অনুষ্ঠানে ক্যানসারজয়ীরা কীভাবে রোগটি মোকাবিলা করেছেন এবং জয়ী হয়েছেন, সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা ও গল্প সবার সঙ্গে শেয়ার করবেন। চিকিৎসকদের মতে, এই ক্যানসারজয়ীদের অভিজ্ঞতা ও গল্প অন্য রোগীদের মনোবল বৃদ্ধি করবে এবং ভয় কাটিয়ে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়তে সাহস জোগাবে।
স্তনে নতুন কোনো গুটি বা লাম্পস, আকৃতির পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা অনুভব করলে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। কারণ সঠিক সময়ে নেওয়া একটি সচেতন পদক্ষেপই নিশ্চিত করতে পারে ক্যানসারমুক্ত সুস্থ জীবন। স্তন ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতার ওপর জোর দিয়ে মেডিকেল অ্যান্ড রেডিয়েশন অনকোলজির কনসালট্যান্ট ডা. হাসনিনা আক্তার বলেন, ‘বাস্তবে স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো ব্যথা থাকে না। এ কারণে শুধু ব্যথা হচ্ছে কিনা, তার ওপর নির্ভর করে স্তনের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।’
অ্যাটেন্ডিং কনসালট্যান্ট ডা. নয়ন ভৌমিক বলেন, ‘নিজেকে সুস্থ মনে হচ্ছে, কোনো ব্যথা নেই, দৈনন্দিন কাজেও সমস্যা হচ্ছে না, তাহলে কি স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি নেই? এই ধারণা অনেকের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে সবসময় প্রাথমিক পর্যায়ে স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। তাই শরীর ভালো লাগাকে একমাত্র নিশ্চয়তা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।’