মেয়র শাহাদাত এবার প্রশাসক

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৩ এএম

মেয়াদ নিয়ে বিতর্ক, মেয়রের দায়িত্ব পালনের বৈধতা নিয়ে নানা সমালোচনার মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ থেকে সরিয়ে ডা. শাহাদাত হোসেনকে এবার প্রশাসক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গতকাল রবিবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। আদালতের রায়ে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের দুই বছরের মাথায় এ পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘আইন অনুযায়ী করপোরেশন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অথবা পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত ডা. শাহাদাত হোসেনকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হলো। নিয়োগকৃত প্রশাসক সিটি করপোরেশনের মেয়রের ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন। জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।

যেভাবে মেয়র হন শাহাদাত : ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচনে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক নিযে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির তৎকালীন আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন। নির্বাচন কমিশন তৎকালীন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এম. রেজাউল করিম চৌধুরীকে বেসরকারিভাবে মেয়র ঘোষণা করে। ওই বছর ১২ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়ে মেয়রের দায়িত্ব পালন শুরু করেন রেজাউল করিম। একই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি নানা অনিয়ম তুলে ধরে নির্বাচনের ফলাফল বাতিল চেয়ে চট্টগ্রামে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলা দায়ের করেন ডা. শাহাদাত। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল এবং যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ খাইরুল আমিনের আদালত ওই মামলায় ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করে রায় দেয়।

আদালত থেকে রায় এলেও শাহাদাত মেয়র হিসেবে শপথ নিতে পারবেন কি না তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ আদালত থেকে যখন তিনি মেয়র হিসেবে রায় পেয়েছেন তার আগেই রেজাউল করিমকে মেয়র পদ থেকে অপসারণ করে তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার তোফায়েল আহমদকে চসিকের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি যথারীতি দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর থেকে মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন ডা. শাহাদাত।

মেয়রের মেয়াদ নিয়ে বিতর্ক : স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯- এর ৬ ধারা অনুসারে সিটি করপোরেশনের মেয়াদ হবে প্রথম সভার তারিখ থেকে পরবর্তী ৫ বছর। মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর রেজাউল করিম সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা করেন ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। এর পর থেকে ডা. শাহাদাতের শপথের দিন পর্যন্ত সময় অতিবাহিত হয়েছে তিন বছর আট মাস ১১ দিন। সেই হিসেবে এক বছর ৩ মাস ২০ দিন মেয়রের দায়িত্ব পালনের কথা ডা. শাহাদাতের, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছর ২২ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ওই সময়ের পরও চসিক নির্বাচন না হওয়া ও শাহাদাতের মেয়রের চেয়ারে থাকা নিয়ে চলে নানা বিতর্ক। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রকাশ্যে জনসভায় তাকে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অবৈধ মেয়র হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অন্যদিকে ডা. শাহাদাত নানা আইনি ব্যাখ্যা সামনে এনে ২০২৯ সাল পর্যন্ত তার মেয়াদ থাকার দাবি করে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এর মধ্যেই স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে তাকে প্রশাসক নিয়োগ করে প্রজ্ঞাপন জারি হলো।

এ বিষয়ে ডা. শাহাদাতের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটে দেখা গেছে ডা. শাহাদাতের পদবি হিসেবে ‘প্রশাসক’ উল্লেখ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বলেন, সরকার নিশ্চয়ই এ সংক্রান্ত আইনগত দিক, মেয়রের মেয়াদকাল সবকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়।

চসিক নির্বাচনে জামায়াতের ঘোষিত মেয়র পদপ্রার্থী শামসুজ্জামান হেলালী এ প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডা. শাহাদাত হোসেনকে কি প্রমোশন দেওয়া হলো নাকি ডিমোশন দেওয়া হলো সেটা বুঝছি না। এ প্রজ্ঞাপনের পর গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত তিনি মেয়র হিসেবে সিটি করপোরেশন থেকে যে বেতন-ভাতা নিয়েছেন, সেটির বৈধতা নিয়ে তো প্রশ্ন থেকে যায়। তিনি এতদিন গর্ব করে বলেছেন, তিনি আদালতের রায়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত মেয়র। আমার প্রশ্ন সরকার কি তাকে চ্যালেঞ্জ করল?

এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডা. শাহাদাত হোসেন ২০২৯ সাল পর্যন্ত মেয়াদ দাবি করে যে অবৈধভাবে মেয়রের চেয়ার ধরে রেখেছিলেন, প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তার সেই দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। সরকারের উচিত ছিল যথাসময়ে সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়ে জনগণের রায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে করপোরেশন পরিচালনা করা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত