বাধার মুখে নারীরাই কবর দিলেন মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৪ এএম

দিনভর উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি, কবর খননে বাধা, কবর দেওয়ার বিরুদ্ধে মিছিলের মধ্যে মৃত্যুর প্রায় ১৭ ঘণ্টা পর মধ্যরাতে পুলিশের উপস্থিতিতে মোবাইল ফোনের আলোতে পরিবারের নারী সদস্যরা কবর খনন করে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর (৮৭) দাফন সম্পন্ন করেছেন। পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াত ইসলামী বাংলাদেশের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম সাক্ষী ছিলেন মানিক পশারী।

শনিবার সকাল ১০টার দিকে তার মৃত্যুর পর রবিবার রাত দেড়টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে নিজ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এ সময় পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মানিক পশারীকে পিরোজপুরে গার্ড অব অনার দেওয়াকে কেন্দ্র করে শনিবার উত্তেজনা দেখা দেয়। স্থানীয় কিছু লোক তাকে এখানে দাফন না করার দাবি জানান। এ সময় পিরোজপুর শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে ও সমবেত হতে দেখা যায়।

পরিবারের অভিযোগ, মরদেহ পিরোজপুরে আনার পর দাফন নিয়ে একের পর এক বাধার মুখে পড়তে হয় তাদের। প্রথমে সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে মরদেহ নামাতে বাধা দেওয়া হয়। পরে বাড়িতে কবর খনন করা হলেও তা মাটি দিয়ে ভরাট করে দেওয়া হয়। পৌর কবরস্থানে দাফনের উদ্যোগেও বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ স্বজনদের।

পরিবারের সদস্যরা জানান, মানিক পশারী প্রায় দুই মাস অসুস্থ ছিলেন। শনিবার সকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাতার বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। পরে স্বজনরা মরদেহ নিয়ে পিরোজপুরে আসেন। দুপুর ১২টার দিকে সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে মরদেহ পৌঁছালে সেখানে উপস্থিত জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেন তারা। পরে পুলিশের সহায়তায় মরদেহ সেখান থেকে সরিয়ে পুলিশ লাইনসে নেওয়া হয়।

বিকেল ৫টার দিকে পুলিশ লাইনসে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এরপর মরদেহ পুলিশি নিরাপত্তায় রাখা হয়। দাফনের স্থান ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় পরিবারের সদস্যদের। পরে সদর থানা পুলিশের সহযোগিতায় মরদেহ চিতলিয়া গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। রাত দেড়টার দিকে দাফন সম্পন্ন হয়।

মানিক পশারীর বোন হেনা পশারী বলেন, শনিবার ভোর ৬টার দিকে ভাইয়ের অসুস্থতার খবর পান। পরে সকাল ১০টার দিকে তার মৃত্যুর খবর জানতে পারেন। মরদেহ পিরোজপুরে আনার পর সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা কবর খুঁড়তে শুরু করেন। কিন্তু সন্ধ্যার পর তারা দেখেন, খনন করা কবর মাটি দিয়ে ভরাট করে রাখা হয়েছে। রাতে মানিক পশারীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে একটি মিছিল বের করা হয়েছে বলেও শুনেছেন তিনি।

হেনা পশারী বলেন, রাত ১১টার দিকে তার দুই বোন আবার কবর খুঁড়তে শুরু করেন। পরে রাত ১টা ২০মিনিটের দিকে তার ভাইয়ের স্ত্রী ও মেয়েসহ পুলিশ মরদেহ নিয়ে আসে। এরপর দাফন সম্পন্ন হয়। দাফনের সময় এলাকার কেউ উপস্থিত ছিলেন না। তবে দাফনের পর আর কোনো সমস্যা হয়নি।

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তার বসতবাড়ি ভাঙচুর করা হয়। প্রাণভয়ে মানিক পশারী এলাকা ছেড়ে টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাতার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সরেজমিনে চিতলিয়া গ্রামের বাড়িতে ঘরের ভিত ছাড়া অন্য কোনো স্থাপনা দেখা যায়নি।

পরিবারের দাবি, নারী সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের বাইরে অন্যরা দাফনে অংশ নিতে এগিয়ে আসেননি। জামায়াত ও স্থানীয় লোকজনের ভয়ে তারা আসেননি বলে অভিযোগ স্বজনদের। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মালেক খান বলেন, ৫ আগস্টের পর মানিক পশারী এলাকায় ছিলেন না। রাতে দাফনের সময় তারা উপস্থিত ছিলেন না; সকালে দাফনের খবর পান।

পিরোজপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি শেখ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মানিক পশারীর মরদেহ দাফনে জেলা জামায়াত বা এর অঙ্গসংগঠনের কোনো নেতাকর্মী বাধা দেননি। জামায়াতে ইসলামী লাশ নিয়ে রাজনীতি করে না। পুলিশকে সহযোগিতা করে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।

পিরোজপুর সদর থানার ওসি মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, পুলিশের নিñিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত