মাদ্রাসা দেশে শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ এবং সমাজে পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত। এমন প্রতিষ্ঠানে কিছু ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীর ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, অশালীন আচরণ এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয় প্রকাশ্যে আসায় সামাজিক পরিসরে বেশ আলোচনা হচ্ছে। এ বিষয়টি সরকারেরও নজরে এসেছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে, একটি অনুষ্ঠানে শনিবার এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য সরকারের এই অবস্থানকে আমরা স্বাগত জানাই।
শিক্ষার্থীদের ওপর এমন নির্যাতন যে শুধু মাদ্রাসায়ই হয়, বিষয়টি এমন নয়। সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরও এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার শিকার হওয়ার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। দেশে বিভিন্ন ঘরানার প্রায় ৭০ হাজার মাদ্রাসা আছে। আবাসিক এবং মহিলা মাদ্রাসা হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানও অনেক। অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক-বালিকাদের আবাসিকব্যবস্থাসহ প্রতিষ্ঠান সাধারণ শিক্ষার তুলনায় মাদ্রাসাব্যবস্থায় অনেক বেশি। অন্যদিকে, সরকারি-বেসরকারি প্রায় সব সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধনসহ সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কমবেশি তদারকির মধ্যে আছে। অন্যদিকে, বহু মাদ্রাসা সরকারি-বেসরকারি তদারকির বাইরে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। আমরা মনে করি, শিক্ষার পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রম নির্বিশেষে সব প্রতিষ্ঠান সরকারি ও ক্ষেত্রভেদে বেসরকারি পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি ও নজরদারিতে আনা প্রয়োজন।
প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় পড়ে, যাদের বড় অংশ দরিদ্র পরিবার থেকে আসা, এতিম, দুস্থ ও অসহায় শিশু। শিক্ষক আছেন কয়েক লাখ। অভিযোগ হলো, একশ্রেণির পুরুষ শিক্ষক-কর্মচারীও বয়স্ক শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত। দেশে প্রচলিত আইন ও ইসলামি বিধিবিধানে এগুলো কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ব্যক্তিবিশেষের অপরাধ হিসেবে কেউ কেউ এগুলোকে অভিহিত করে ঘটনার বিস্তার এবং ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এমন প্রবণতা উদ্বেগজনক। আমরা মনে করি, অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী প্রতিটি ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।
ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগ শিশু হওয়ায় তারা বোঝেও না যে, তাদের সঙ্গে মারাত্মক অপরাধ করা হচ্ছে। অনেকে এতিম, দরিদ্র পরিবারের সদস্য এবং সামাজিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থাকায় এড়িয়ে যায়। আমরা মনে করি, সচেতনতা বৃদ্ধিসহ সামাজিক পরিসরে এমন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যাতে ছেলেমেয়েরা তাদের সঙ্গে শিক্ষকসহ যে কারও যৌন নির্যাতনমূলক ঘটনা জানানোর সুযোগ পায়। এক্ষেত্রে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও সমাজ থেকে তাদের সাহস জোগাতে হবে; পাশে থাকতে হবে।
ভবিষ্যতে ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসার তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপনসহ কড়া নজরদারির আওতায় আনতে হবে। বালক-বালিকাদের নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত আবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে রাখার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করতে হবে। বালিকা ও নারীশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সব শিক্ষক-কর্মচারী অবশ্যই নারী হতে হবে। গণরুম, এতিম ও পথশিশুদের থাকার স্থানে নজরদারি থাকতে হবে। শিক্ষক ও সিনিয়র শিক্ষার্থীরা জুনিয়র শিক্ষার্থী থেকে শারীরিক সেবা নেওয়া কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে; নিলে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আচরণবিধি তৈরি করতে হবে; যা অবশ্যই মানতে হবে।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বন্ধে অভিযোগ গ্রহণ ও তদারকির জন্য হাইকোর্ট বিভাগের একটি নির্দেশনামূলক রায় আছে। এ নির্দেশনা কার্যকর করার ব্যবস্থা নিতে হবে। জেলা, উপজেলা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায় পর্যন্ত সরকারি, স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ, শীর্ষ আলেম ও অভিভাবক প্রতিনিধি নিয়ে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠানে যৌন ও গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ এলে সরেজমিন তদন্ত করতে হবে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মিললে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিকব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে সোপর্দ করতে হবে।
মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষায় পড়াশোনা করা অনেকে অন্য কর্মসংস্থান করতে না পেরে যত্রতত্র নিজেই মানহীন মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেন খোলেন। মানহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পরিবর্তে তাদের সম্মানজনক পেশার জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
আমরা মনে করি, জরুরিভিত্তিতে এসব ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।