ব্রাজিলের জাতীয় নির্বাচনে ভোটে জিতে ইতিহাস গড়েছেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ব্রাজিল তো বটেই, পুরো লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে চতুর্থ মেয়াদে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন তিনি। আর এই অর্জন এসেছে তার ৮১তম জন্মদিনের মাত্র কয়েক দিন আগে। এমন এক বয়সে, যখন অনেক নেতা রাজনীতি থেকেই সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দেশটির ডানপন্থি প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে লুলার অসাধারণ প্রত্যাবর্তন আরেকটি রেকর্ডও গড়েছে। ১৯৮৫ সালে ব্রাজিলে গণতন্ত্র ফেরার পর কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থীই প্রথম দফায় পিছিয়ে থেকেও দ্বিতীয় দফায় ফল ঘুরিয়ে দিতে পারেননি। ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী লুলা দুই দফার ভোটের মধ্যের তিন সপ্তাহে ১ কোটির বেশি ভোট বাড়ান। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বাড়াতে পেরেছেন মাত্র ৩৬ লাখ ভোট। দেশটির নির্বাচনী ফল অনুযায়ী, ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮.২১ শতাংশ ভোট। বিপরীতে লুলা পেয়েছেন ৫১.৭৯ শতাংশ ভোট।
২০২২ সালে ফ্লাভিওর বাবা ও সে সময়ের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোকে যে ব্যবধানে হারিয়েছিলেন, এবার তার চেয়েও বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন লুলা। আর এই প্রত্যাবর্তন লাতিন আমেরিকার বামপন্থি রাজনীতির প্রধান মুখ হিসেবেও লুলার অবস্থান ধরে রাখল। চার বছর আগে যেমন তার বাবা করেছিলেন, তেমনি এবার ফ্লাভিও বলসোনারোও নির্বাচনের ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আদালতের মাধ্যমে নির্বাচন বাতিলের চেষ্টা করবেন। ভোটের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর সুপ্রিম ফেডারেল কোর্টের বিচারপতি ক্রিশ্চিয়ানো জানিনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন এই সিনেটর। তার যুক্তি, সিদ্ধান্তটি সব জায়গায় সমানভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় ভোটারদের জন্য সমান সুযোগ ক্ষুণœ হয়েছে।
এই জয় লুলার রাজনৈতিক স্থায়িত্ব প্রমাণ করলেও, বলসোনারোর পরাজয় কংগ্রেস ও অঙ্গরাজ্য সরকারগুলোতে ডানপন্থিদের প্রভাব কমায়নি। এটাই লুলার পরবর্তী মেয়াদের বড় বৈপরীত্য; ঐতিহাসিক নির্বাচনী জয়, কিন্তু সরকার পরিচালনার জায়গা সীমিত। লুলার অপ্রত্যাশিত জয়ের পেছনে কী ছিল, প্রথম দফার ঘাটতি লুলা কীভাবে ঘুরিয়ে দিলেনÑ তার একটি বড় ব্যাখ্যা পাওয়া যায় ভোটের ভৌগোলিক চিত্রে। ব্রাজিলের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভোটারসংখ্যার অঙ্গরাজ্য মিনাস জেরাইসে প্রথম দফায় প্রায় ৫ লাখ ৯০ হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় প্রায় ৯৯ হাজার ভোটে এগিয়ে যান। অর্থাৎ দুই প্রার্থীর ব্যবধান দাঁড়ায় প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার ভোটের।
সাও পাওলো ও রিও ডি জেনেইরো অঙ্গরাজ্যে ফ্লাভিও এগিয়ে থাকলেও, দুই অঙ্গরাজ্যের রাজধানী জিতে নেন লুলা। রিও শহরে প্রথম দফার ফলও উল্টে দেন তিনি। তার এই অগ্রগতি আরও শক্তিশালী হয় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নয়টি অঙ্গরাজ্যের সবগুলোতে জয় ও ভোটার উপস্থিতি বাড়ার কারণে। প্রথম দফায় অনুপস্থিতির হার ছিল ২১ দশমিক ০৮ শতাংশ। দ্বিতীয় দফায় তা কমে প্রায় ১৯ দশমিক ২ শতাংশে নামে। নির্বাচনী লড়াই শুধু মাঠে হয়নি, ডিজিটাল মাধ্যম এই নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব রেখেছে। প্রথম দফায় দ্বিতীয় হওয়ার পর ডিজিটাল প্রচার জোরদার করেন লুলা। লক্ষ্য ছিল নিজের নাগাল বাড়ানো এবং বিদ্যমান সমর্থনকে বাস্তব ভোটে রূপ দেওয়া। চ্যালেঞ্জ শুধু অনিশ্চিত ভোটারদের বোঝানো ছিল না। যারা আগে থেকেই লুলাকে পছন্দ করতেন, তাদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসাটাও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে একাধিক বড় চ্যালেঞ্জ : জয়ের উদযাপন শেষ হলে লুলার প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ হবে আইনসভা। ৫১৩ আসনের চেম্বার অব ডেপুটিজে ডানপন্থি দলগুলোর হাতে থাকবে ৩০৩টি আসন। বামপন্থিদের হাতে থাকবে ১২৪টি ও মধ্যপন্থিদের ৮৬টি। সিনেটেও প্রায়
দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ন্ত্রণ করবে ডানপন্থিরা। তবে এর অর্থ এই নয় যে ওই সব আইনপ্রণেতাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে লুলার বিরোধিতা করবেন। তবে নিজের প্রস্তাব এগিয়ে নেওয়া এবং সরকারের অগ্রাধিকার রক্ষায় তাকে নিজস্ব রাজনৈতিক ঘাঁটির বাইরে জোট গড়তে হবে। অঙ্গরাজ্য সরকারগুলোর মানচিত্রও দেখায়, রক্ষণশীল শিবির এখনো কতটা শক্তিশালী। দুই দফার ভোট মিলিয়ে বলসোনারোর লিবারেল পার্টি পাঁচটি গভর্নর পদ জিতেছে। রিপাবলিকানস ও প্রগ্রেসিভ পার্টি চারটি করে। ওয়ার্কার্স পার্টি জিতেছে চারটি। অন্যদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটের নেতাদের একত্র করা সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি আরও পাঁচটি গভর্নর পদ পেয়েছে। এসব গভর্নরের সঙ্গে সমঝোতাও লুলার জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কারণ নীতি বাস্তবায়নে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের সহযোগিতা প্রয়োজন।
বিজয় ভাষণে লুলা বলেন, ‘নির্বাচন জয়ের পর আর আমাদের কোনো প্রতিপক্ষ থাকে না। আমাকে ২১ কোটি ৫০ লাখ মানুষের জন্য সরকার চালাতে হবে’। রক্ষণশীল আইনসভার সঙ্গে কাজ করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কংগ্রেস আমি বেছে নিইনি। জনগণ বেছে নিয়েছে। আর এই কংগ্রেসের সঙ্গেই আমাকে কাজ করতে ও ফল আনতে হবে’। লুলার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনৈতিক উন্নতির সুফল এমনভাবে পৌঁছে দেওয়া, যাতে সাধারণ ব্রাজিলীয়রা তা দৈনন্দিন জীবনে অনুভব করতে পারেন। নির্বাচনী প্রচারে লুলার জনপ্রিয়তা কমার অন্যতম কারণ ছিলÑ অর্থনীতি নিয়ে মানুষের নেতিবাচক ধারণা।
নিরাপত্তা ইস্যুতেও চাপ : নিরাপত্তা আরেকটি বড় চাপের জায়গা হবে। ডানপন্থিরা অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানকে নিজেদের প্রধান রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছে। তাই লুলাকেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবির জবাব দিতে হবে। প্রচারের শেষ পর্যায়ে তিনি গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধমূলক দায়ের বয়স ১৬ বছরে নামিয়ে আনার বিষয়ে আগ্রহের কথা বলে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেন। এই প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে ডানপন্থিরা সমর্থন করে আসছে এবং জনসমর্থনও তুলনামূলকভাবে ব্যাপক। আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে উত্তরসূরি তৈরি করা। কারণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন জেতার ক্ষেত্রে ব্রাজিলীয় বামপন্থির সক্ষমতা এখনো অনেকটাই লুলার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর নির্ভরশীল।
ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন : চতুর্থ মেয়াদের প্রস্তুতির সময় লুলাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালনা করবেন। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে ওয়াশিংটনকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন, ‘ব্রাজিল কারও পেছনের উঠান নয়’। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্কতার সঙ্গেও কাজ করেছেন। বছরের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলীয় পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা তিনি খোলা রেখেছিলেন। ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ও ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির গবেষক মাইকেল পার্লবার্গ সিএনএনকে বলেন, ‘লুলা প্রথমবার ক্ষমতায় আসার সময় যে রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল; এখনকার পরিস্থিতি তার থেকে একেবারে আলাদা। তখন অঞ্চলে তার বেশ কয়েকজন মিত্র ছিলেন এবং ব্রাজিলের স্বার্থে দুই দিকেই খেলার সুযোগ ছিল’।
পার্লবার্গ বলেন, ‘ট্রাম্পের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছেন লুলা। কখনো কঠোর সমালোচনা করেছেন, আবার কখনো সমঝোতামূলক আচরণ করেছেন’। তার মতে, ‘লুলার কাছে সার্বভৌমত্ব মানেই সংঘাত নয়। বরং তিনি মনে করেন, সংঘাত সবসময় সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী করে না। লুলা মতাদর্শগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী নন। ডানপন্থি সরকারের সঙ্গে কাজ করতেও তার অসুবিধা নেই’। পার্লবার্গ আরও বলেন, পুনর্নির্বাচিত লুলা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ‘তার অবস্থান কিছুটা ভালো হতে পারে’, কারণ তখন প্রেসিডেন্টের এজেন্ডা নিয়ে কংগ্রেসে আরও বেশি নজরদারি তৈরি হতে পারে।